ইরানের আকাশে বোমার বিস্ফোরণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে তেহরানের বাসিন্দা আরিয়ান মনে করেছিলেন, হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ দশকের কঠোর ধর্মতান্ত্রিক শাসন। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই আশার জায়গা দখল করেছে গভীর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। রাতভর আকাশজুড়ে বোমাবর্ষণ, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া শহর এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতি দেখে তিনি বুঝতে পারছেন, যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা হয়তো কেবলই মরীচিকা।
আরিয়ানের ভাষায়, হামলা এমনভাবে চলছে যে রাত আর দিন আলাদা করে বোঝা যায় না। বিস্ফোরণের আলোয় রাত যেন সকাল হয়ে ওঠে, আবার ধোঁয়ায় ঢাকা সকাল মনে হয় অন্ধকার রাতের মতো। এই পরিস্থিতি শুধু তাকে নয়, পুরো দেশের মানুষকে ক্রমশ হতাশ করে তুলছে।
যুদ্ধের মাঝখানে আটকে থাকা কোটি মানুষ
ইরানের প্রায় নয় কোটিরও বেশি মানুষ এখন দুই ভয়ের বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছে। একদিকে বিদেশি হামলার ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে দেশের শাসকদের কঠোর সতর্কবার্তা। হামলার মধ্যেই বিদেশি নেতারা ইরানিদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। আর দেশের শাসকগোষ্ঠী ঘোষণা দিয়েছে, যে কেউ বিদ্রোহের চেষ্টা করলে কঠোর রক্তপাতের মুখোমুখি হতে হবে।
দেশটির অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মালজু সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনে ক্লান্ত একটি সমাজ হঠাৎ করে বাইরের আগুনে ঘিরে গেছে। তার মতে, যুদ্ধ কোনো সংস্কারের পথ খুলে দেয় না, বরং নতুন সংকট তৈরি করে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে রাজধানী
তেহরানের রাস্তায় আগুন, আকাশে ধোঁয়ার স্তর আর আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষ এখন দৈনন্দিন দৃশ্য হয়ে উঠেছে। হামলার প্রথম দিকেই একটি বিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে যায়। অনেক মা তাদের সন্তানদের নিয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, কারণ বাড়ির অন্য অংশগুলো নিরাপদ মনে হচ্ছিল না।
গত কয়েক মাস ধরেই ইরান নানা সংকটে জর্জরিত। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছিল, আগের সংঘাতের ক্ষত এখনো পুরোপুরি সারেনি। এর মধ্যে কয়েক মাস আগে সরকারবিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল, যাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই আঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
শাসনব্যবস্থার শক্ত অবস্থান
ক্রমাগত হামলার পরও দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর ভাঙনের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় বিপুল সংখ্যক আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যকে মোটরসাইকেলে টহল দিতে দেখা যাচ্ছে। তারা ধর্মীয় স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় ঘুরছে এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এক বাসিন্দা জানান, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পর কয়েকজন মানুষ আনন্দ প্রকাশ করলেও পরে তাদের সতর্ক করা হয় যে এমন আচরণ আবার করলে বাড়িতে অভিযান চালানো হবে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। অনেকের ফোনে সরকারপন্থী সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ছবি তোলা বা সন্দেহজনক আচরণ দেখলে তা জানাতে বলা হচ্ছে।
তথ্যের অন্ধকারে সাধারণ মানুষ
যুদ্ধের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থাও বড় সংকটে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, তারা কার্যত ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ফলে নিজের দেশের পরিস্থিতি বোঝার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্যও তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
একজন প্রকৌশলী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, সরকারি সংবাদমাধ্যম যেমন পুরো সত্য বলছে না, তেমনি বিদেশি সংবাদও সব সময় বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। তার মতে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের পুরো চিত্র কোথাওই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না।

ধোঁয়া, দূষণ ও নতুন সংকট
সাম্প্রতিক হামলায় তেল সংরক্ষণাগার উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তেহরানের আকাশে কালো ধোঁয়ার স্তর তৈরি হয়েছে এবং তেলমিশ্রিত কালো বৃষ্টি পড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অন্যদিকে একটি বড় পানিশোধন স্থাপনাও ধ্বংস হয়ে গেছে, যা দেশটির পানিসংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ অসহায় বোধ করছেন। অনেকেই কাজ করতে পারছেন না, বাড়িতে বসেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখছেন।
স্বাধীনতার আশা নাকি ধ্বংসের পথ
দেশের কিছু অঞ্চলে এখনো আশা রয়েছে যে এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় এমন আশার কথা শোনা যাচ্ছে।
তবে তেহরানের অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, এই যুদ্ধের মূল্য অত্যন্ত বেশি হয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, যে সরকারই ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসুক না কেন, দেশ চালানোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকা জরুরি। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেলে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
এক তরুণ উদ্যোক্তার ভাষায়, শুরুতে মনে হয়েছিল এই সংঘাত হয়তো ভেতরের পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে। কিন্তু এখন বাস্তবতা ভিন্ন। তার মতে, সহযোগিতার বদলে দেশ ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















