ইরাকের রাজধানী বাগদাদে একটি বড় মার্কিন কূটনৈতিক সহায়তা কেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সমর্থিত মিলিশিয়ারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালিয়েছে। ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সহিংসতার নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাগদাদে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা
মঙ্গলবার বাগদাদের ডিপ্লোম্যাটিক সাপোর্ট সেন্টার নামের একটি বড় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এটি মূলত মার্কিন কূটনীতিকদের জন্য একটি বড় লজিস্টিক কেন্দ্র, যা ইরাকি সামরিক ঘাঁটি এবং বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত।
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, মোট ছয়টি ড্রোন ওই স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি ড্রোন আকাশেই ভূপাতিত করা সম্ভব হয়। তবে একটি ড্রোন মার্কিন স্থাপনায় আঘাত হানে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ড্রোনটি একটি নিরাপত্তা টাওয়ারের কাছে আঘাত করে। ঘটনার পরপরই সেখানে অবস্থানরত কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ডাক অ্যান্ড কভার’ নির্দেশ দেওয়া হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সতর্ক বার্তায় জানানো হয়েছে, হামলার পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও উপস্থিত ব্যক্তিদের হিসাব নেওয়ার কাজ চলছে।

ইরাকের প্রতিক্রিয়া
ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামরিক ঘাঁটির আশপাশে হওয়া হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন স্থাপনাটির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার এ ধরনের হামলা দেখে চুপ করে থাকবে না। যারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আইনের আওতায় আনা হবে।
কারা থাকতে পারে হামলার পেছনে
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা, হামলাটি ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর সদস্যরা চালিয়ে থাকতে পারে। এই জোটের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন, যিনি বিশ্বের কোটি কোটি শিয়া মুসলমানের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এরপর থেকেই ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি বাড়ছে
বাগদাদের এই হামলা আবারও দেখিয়ে দিল যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা ও কর্মীরা এখনও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে প্রায় ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাসগুলোও হামলার লক্ষ্য
গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে। কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাসের একটি ভবন এবং দুবাইয়ে কনস্যুলেট ভবনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অপ্রয়োজনীয় কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব থেকেও সম্প্রতি বেশ কিছু কূটনীতিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রিয়াদ দূতাবাসে বড় ক্ষতি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও সম্প্রতি একটি ড্রোন হামলা হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাস ভবনের কিছু অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো আর ব্যবহারযোগ্য নয় এবং সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, হামলায় ভবনের ওপরের তলায় থাকা একটি গোয়েন্দা কার্যালয়ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখে। বিশেষ করে ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সহায়তার ইতিহাস এখনও দুই দেশের সম্পর্কের বড় একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















