মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ধাক্কা সরাসরি পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছাতেই তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে জ্বালানি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বড় ধাক্কা খেতে পারে।
তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
সংঘাতের প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। জ্বালানি বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় এই অস্থিরতা বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করে। অনেক দেশের নেতারা আশঙ্কা করছেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তবে এর আর্থিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রভাবশালী সাত দেশের অর্থমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তেলের সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় মজুত ব্যবহার করা হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জানান, যুদ্ধ দ্রুত শেষের দিকে যাচ্ছে। এরপরই তেলের দাম কিছুটা কমে প্রায় ৮৫ ডলারে নেমে আসে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় চাপ বাড়ছে ভোক্তাদের ওপর
যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়ে গ্যালনপ্রতি প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর ফলে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে ভোক্তারা ব্যয় কমিয়ে দিতে পারেন, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয়ই মোট প্রবৃদ্ধির প্রায় ৭০ শতাংশ চালিত করে। তাই জ্বালানির এই ধাক্কা অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
শেয়ারবাজারে অস্থিরতা
জ্বালানির দাম বাড়ার খবর প্রথমে আর্থিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বড় বড় শেয়ার সূচকে পতন দেখা যায়। পরে সরকার বাজারকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, তেলের দামের এই উত্থান সাময়িক হতে পারে এবং সামরিক অভিযানের লক্ষ্য পূরণ হলে বাজার আবার স্থিতিশীল হবে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বড় অর্থনৈতিক সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
কিছু অর্থনীতিবিদের হিসাব অনুযায়ী, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে তবে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের বেশি হতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও পূর্বাভাসের তুলনায় কমে যেতে পারে।
নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে চলে যায়। ফলে তেলের দাম বাড়লে তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তবে যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ হয়, তাহলে বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারে বলে আশা করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















