শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে একটি মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় একটি ইরানি ফ্রিগেট ডুবে যাওয়ার খবর—এবং এতে ইরানি নাবিকদের মর্মান্তিক প্রাণহানি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমের বিভিন্ন অংশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরপর ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আটকে পড়া অন্যান্য ইরানি নৌযান ও নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে আরও আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা বেড়েছে।
তবে এই আলোচনার বড় অংশই অনেকটা শেক্সপিয়ারের নাটক Much Ado About Nothing-এর মতো, যেখানে ধারণা ও বাস্তবতার মধ্যে তীব্র পার্থক্য দেখা যায়। প্রকৃত বিষয়টি হলো, ভারত ও শ্রীলঙ্কা একটি নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখে এমন এক ধরনের কৌশলগত বাস্তববাদ দেখিয়েছে, যা ক্রমশ আরও অস্থির হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রয়োজন হবে।
প্রাণহানি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মর্মান্তিক, এবং এই পরিস্থিতির মানবিক দিকটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তবু কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, উভয় সরকারই একটি সূক্ষ্ম ও জটিল চ্যালেঞ্জকে উল্লেখযোগ্য সংযম ও বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে।
কিছু সমালোচকের মতে, অঞ্চলের প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে ভারতের উচিত ছিল আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কার্যক্রম ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত এলাকায় প্রসারিত করেছে। অন্যদিকে, অনেকে—যারা ভারত মহাসাগরকে দীর্ঘদিন ধরে “শান্তির অঞ্চল” হিসেবে দেখার ধারণায় বিশ্বাসী—মনে করেন, এ ধরনের সংঘাতের ঢেউ এই জলসীমায় একেবারেই আসা উচিত নয়।

কিন্তু এ ধরনের যুক্তি সেই কৌশলগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে, যা বহুদিন ধরেই এই অঞ্চলের চরিত্র নির্ধারণ করে আসছে। ভারত মহাসাগর কখনোই ভূরাজনৈতিক শূন্যতা ছিল না। ইতিহাসজুড়ে এখানে একাধিক বৃহৎ শক্তির উপস্থিতি ও স্বার্থ সক্রিয় ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দিয়েগো গার্সিয়ায় একটি বড় সামরিক ঘাঁটি বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, জিবুতিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি এবং স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত মহাসাগরকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে—এমন প্রত্যাশা ক্রমশ অবাস্তব হয়ে উঠছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ঠিক এই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ভারত মহাসাগর একটি জটিল কৌশলগত ক্ষেত্র, যেখানে বহু শক্তির স্বার্থ ও সক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করছে। এখানে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারত নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—তবে তা করতে হবে আদর্শিক কল্পনার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত কাঠামোর মধ্যে।

এই ঘটনাটি আরেকটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরে, যা প্রায়ই ভারত নিজের জন্য যে “নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার” ভূমিকার কথা বলে তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এত জটিল সামুদ্রিক পরিসরে নেতৃত্ব দেওয়া সব সময় নাটকীয় পদক্ষেপ বা প্রকাশ্য মুখোমুখি সংঘর্ষের মাধ্যমে হয় না। বেশিরভাগ সময় এতে প্রয়োজন হয় নীরব কূটনীতি, সতর্ক সংকট ব্যবস্থাপনা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার সক্ষমতা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় সংযমই শক্তির প্রকাশকে প্রকাশ্য ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে তুলে ধরে।
অনেক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এখনো বৈশ্বিক রাজনীতিতে চলমান একটি গভীর পরিবর্তন স্বীকার করতে অনীহা দেখাচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে এবং অনেক দিক থেকেই ইতোমধ্যে পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্ব যে পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে—এই ধারণা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে তার জায়গায় আরও তরল ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
উদীয়মান বৈশ্বিক পরিসর সম্ভবত হবে অগোছালো, বিতর্কপূর্ণ এবং কখনো কখনো বিপজ্জনক—যা অনেক দিক থেকে ১৯শ শতাব্দীর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার “দ্য গ্রেট গেম”-এর মতো হবে, ১৯৪৫ সালের পর গড়ে ওঠা তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মতো নয়।
এই সময়ের অনেক আগেই ধ্রুপদি বাস্তববাদী চিন্তাবিদ হ্যান্স মরগেনথাউ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে পরিচালিত করার কেন্দ্রীয় ধারণা হলো “ক্ষমতার ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত স্বার্থ।” আজ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের আচরণে সেই উপলব্ধি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
![]()
বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ভারত ও শ্রীলঙ্কা ঠিক এই ধরনের বাস্তববাদই প্রদর্শন করেছে—মানবিক বিবেচনার সঙ্গে কৌশলগত সতর্কতার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়িয়ে।
বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা বাড়তে থাকলে এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সামুদ্রিক অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে, এই ধরনের বাস্তববাদ আরও বেশি প্রয়োজন হবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং বিচক্ষণতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করা।
ভারত ও শ্রীলঙ্কা সেই দিকেই একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করা যায়, তারা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো একসঙ্গে কাজ করে ক্রমশ আরও জটিল হয়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক সময়ে ভারত মহাসাগরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করবে।
লেখক পরিচিতি: মিলিন্দা মোরাগোদা একজন সাবেক শ্রীলঙ্কান মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনীতিক এবং কৌশলগত বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাথফাইন্ডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।
মিলিন্দা মোরাগোদা 



















