আমি তেহরানের মানুষের ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ভরে উঠেছি। এই শহরে আমি তিন বছর বাস করেছি। পাহাড়ে ঘেরা হওয়ার কারণে সাধারণ সময়েও তেহরানে ভয়াবহ দূষণ থাকে, কারণ বাতাস সেখানে আটকে যায়। এখন সেই শহর এমন এক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে যেখানে বাতাসের মান আগের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিশেষজ্ঞরা ইরানিদের সতর্ক করে বার্তা দিচ্ছেন—সম্ভব হলে বাইরে না যেতে। যদি বের হতেই হয়, তবে বাড়ি ফিরে সঙ্গে সঙ্গে কাপড় বদলে ধুয়ে ফেলতে বলা হচ্ছে, কারণ বাতাস এতটাই দূষিত যে পোশাক পর্যন্ত দূষিত হয়ে যেতে পারে।
গত রাতে তেলের মজুত ধ্বংস হওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে কত মানুষ মারা যাবে? আর সামনে আরও কত রাত এমন ধ্বংস নেমে আসবে—যেখানে মানুষের ওপর নেমে আসছে যেন বাইবেলের নরকাগ্নির মতো আগুন? শুধু এটুকুই নয়—হাসপাতাল ধ্বংস হওয়া, পানির অভাব, জ্বালানির সংকট—এসবের কারণে আরও কত ইরানি প্রাণ হারাবে?
এই সেই দেশ, যা ইরান-ইরাক যুদ্ধে রাসায়নিক হামলার শিকার হয়েছিল। সেই হামলার শিকার মানুষেরা দশকের পর দশক ধরে তার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছেন।
অজ্ঞতা ও ভুল ধারণা
এ ঘটনার পাশাপাশি যে বর্ণবাদী অজ্ঞতা দেখা যাচ্ছে, সেটিও বিস্ময়কর। গত রাতে অনেকে বলছিলেন, নাকি তেহরানের নর্দমায় আগুন লেগে গেছে এবং সেখানে তেল জ্বলছে। কিন্তু তেহরানে খোলা নর্দমা নেই।
সেখানে রয়েছে ‘জুব’—রাস্তার পাশে তৈরি সুন্দর ও উন্নত পানির চ্যানেল, যা পাহাড়ি পানি শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করে। এখন সেই চ্যানেলে তেলের আগুন বইছে। এর ফলে গ্রীষ্মে ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপের মধ্যে যে গাছগুলো রাস্তার ধারে ছায়া দেয়, সেগুলো পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সবুজ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয়তো দশক লেগে যাবে।

এছাড়াও নারীদের নিয়ে নানা ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। অনেকেই বলছেন ইরানে নারীরা বোরকা পরে। কিন্তু আমি কখনো ইরানে বোরকা দেখিনি। সেখানে ‘চাদর’ ব্যবহৃত হয়, যা সম্পূর্ণ আলাদা পোশাক। আর যারা চাদর পরেন, তারাও প্রয়োজনে শক্তভাবে প্রতিরোধ করতে পারেন।
ইরানে শিশুর মাথা কেটে ফেলা হয়—এ ধরনের অভিযোগও সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইরানি কন্যাশিশুরা বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুতে ভালো—এমন কথাও সত্য নয়। আবার অনেকেই বলছেন আইআরজিসি মানে “রিপাবলিকান গার্ড”, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি “বিপ্লবী গার্ড”।
এমনকি কেউ কেউ বলছেন উত্তরে “শোমাল” নামে কোনো শহর আছে। বাস্তবে “শোমাল” ফারসি ভাষায় শুধু “উত্তর” অর্থ বোঝায়। আর ইরানি নারীরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত—এ কথাও ভুল। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহু নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
জাতীয় গর্ব ও অপমানের প্রশ্ন
ইরানিরা তাদের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। তাই তাদের অপমান করলে তারা সহজে তা মেনে নেয় না। “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করা মানে আগুনে আরও তেল ঢেলে দেওয়া।
গতকাল যখন উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র এমন মন্তব্য করেছে এবং একটি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রেও বোমা হামলা চালিয়েছে—যা পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ কথা হচ্ছে—এই যুদ্ধের ফলে নাকি ইরানের সীমানা পরিবর্তন হতে পারে। এমন চিন্তাই ইরানের জন্য অকল্পনীয়। কারণ তারা মনে করে ইতিমধ্যেই বৃহত্তর পারস্যের অনেক অংশ হারিয়ে গেছে।
তারপর আবার শুনছি, ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি খার্গ দ্বীপ দখল করতে চাইতে পারেন। এই ধারণার পাগলামি, ব্যাপ্তি এবং ঘটনাগুলোর দ্রুত ঘূর্ণাবর্ত—সবকিছু বোঝা সত্যিই কঠিন হয়ে উঠছে।

ব্রিটেনের রাজনৈতিক দ্বিচারিতা
আমি খুশি যে ট্রাম্পের কাছে স্টারমার অপমানিত হয়েছেন। হয়তো এতে ব্রিটেন আর তাকে এবং ইসরায়েলকে সহায়তা করবে না।
ব্রিটেনের কিছু রাজনীতিবিদ বলছেন, ইরান নাকি ব্রিটিশ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে, তাই যুক্তরাজ্যের যুদ্ধে জড়ানো উচিত। কিন্তু যখন ব্রিটিশ নাগরিকদের আটক করা হয়েছিল, অথবা বিবিসি ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল পার্সিয়ান সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নিপীড়ন চালানো হয়েছিল—তখন তারা কোথায় ছিলেন? তখন তারা সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।
আর ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের প্রস্তাব দেওয়া নিছকই বোকামি। কারণ এমন পরিস্থিতিতে তিনি নিজ দেশে ফিরবেন কীভাবে?
শেষ কথা
ইরানের শাসনব্যবস্থার প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি নেই। বরং আমি চাই সেই শাসনব্যবস্থার অবসান হোক। কিন্তু এই যুদ্ধ সেই প্রশ্নের বিষয় নয়।
এটি সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা, যারা বছরের পর বছর এই শাসনের অধীনে কষ্ট পেয়েছে। তারা তাদের দেশের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।
(ফ্রান্সেস হ্যারিসন: বিবিসির সাবেক সাংবাদিক, তিনি মধ্যপ্রাচ্যর মতো বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ায়ও কাজ করেছেন, শ্রীলংকার তামিল গণহত্যা, ও পলিটিক্যাল ইসলাম সহ বহু বিষয়ের তথ্য নির্ভর বইয়ের লেখক। এই লেখাটি তার ফেস বুক ওয়াল থেকে নেয়া)
ফ্রান্সেস হ্যারিসন 




















