ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও তার প্রেস সচিবের বক্তব্য জনমনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি করতে বাধ্য বলে মন্তব্য করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোর এই জোটের অভিযোগ, নির্বাচন ঘিরে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি, বরং কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার আগে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করে। জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকার এখনো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই এবং বড় দলের প্রভাবশালী প্রার্থীরা প্রকাশ্যেই ভোটের আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক দলগুলো নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার করে তথাকথিত বেহেস্তের টিকিট বিক্রি করছে, যা আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।
প্রধান উপদেষ্টা ও প্রেস সচিবের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি
গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় এক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তরুণদের গড়া একটি নতুন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। এ বক্তব্যকে আগাম ফল ঘোষণার শামিল বলে মনে করছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
এরপর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ভোট গণনায় দেরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে রেফারেন্ডাম ও পোস্টাল ব্যালটের কারণে গণনা বিলম্বিত হতে পারে বলে জানানো হয়। এসব মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যখন আগাম নির্বাচনী ফলের ইঙ্গিত দেন এবং প্রেস সচিব যখন ভোট গণনায় বিলম্বের কথা বলেন, তখন সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রার্থী তালিকা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে ৬৫টি আসনে সিপিবি এবং ৩৬টি আসনে বাসদের প্রার্থী রয়েছেন। একটি আসনের প্রার্থিতা এখনো আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির চিত্র
ইশতেহার উপস্থাপনের সময় বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২৫ হাজারেরও বেশি। মানুষের প্রত্যাশা ছিল শোষণ, বৈষম্য ও দুঃশাসন থেকে মুক্তি, কিন্তু সেই মুক্তি আসেনি। অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হয়নি এবং মব সন্ত্রাস গোটা দেশকে বিপর্যস্ত করেছে।

তিনি বলেন, মাজার, খানকা, আখড়া ও মন্দিরসহ ভিন্ন মত ও পথের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর হামলা চলছে। বাউলদের নির্যাতন, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া এবং কথিত ধর্ম অবমাননার নামে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে সরকার মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করার কারণ
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট কেন জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি, সে ব্যাখ্যায় বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, দীর্ঘ আট মাসের আলোচনা ও বিতর্কের সারবস্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত সনদে প্রতিফলিত হয়নি। বরং দলগুলোর ভিন্নমত যুক্ত করেই সনদ তৈরি করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার মতে, সনদে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকলেও যারা ভিন্নমত দিয়েছে তারা কীভাবে সেই অঙ্গীকার করবে, তা অস্পষ্ট। উপরন্তু সনদ নিয়ে আদালতে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি।
নির্বাচনি অঙ্গীকারের মূল কথা
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জানিয়েছে, ক্ষমতায় এলে মতপ্রকাশ, সংগঠন, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং বিচার বিভাগকে নির্বাহী প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জোটটি।
আইনের শাসন ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে অতীতের আলোচিত ও অনিষ্পন্ন বিচার, বিশেষ করে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধ, দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা জোরদার এবং সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও মবসন্ত্রাস দমনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ও বিকেন্দ্রীকরণ
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথাও জানিয়েছে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচন এবং নারীদের অন্তত ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগসহ জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের নেতারা, যারা সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















