মাদ্রিদের অভিজাত সালামানকা পাড়ায় দিন কাটছে আশা আর আশঙ্কার মাঝামাঝি। ভেনেজুয়েলার হাজারো নির্বাসিত এখানে জড়ো হয়ে একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন দ্রুত দেশে ফেরার, পরিবারকে দেখার, রাজনীতিতে ফেরার কিংবা তেলের বিপুল সম্পদের আবার ভাগ বসানোর। নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তার হয়ে নিউইয়র্কে কারাগারে থাকলেও সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবের মুখ দেখেনি।
নির্বাসিত রাষ্ট্রপতির মাদ্রিদের দিন
ভেনেজুয়েলার দুই হাজার চব্বিশ সালের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হলেও ক্ষমতায় বসতে পারেননি এদমুন্দো গনসালেস। সামরিক বাহিনী ও শাসকগোষ্ঠীর অনড় অবস্থানের মুখে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। এখন মাদ্রিদের এক সাধারণ ফ্ল্যাট থেকেই তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। স্ত্রী ঘর গুছিয়ে রাখেন, দেয়ালে ঝুলে আছে কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক। এখান থেকেই তিনি বন্দি মুক্তির উদ্যোগ নেন, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দীর্ঘমেয়াদি এক ছায়া সরকারের রূপরেখা তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন।
মাদ্রিদ কেন ভেনেজুয়েলার কেন্দ্র
স্পেনে প্রায় সাত লাখ ভেনেজুয়েলান বসবাস করেন, যা আমেরিকা মহাদেশের বাইরে সবচেয়ে বড় সম্প্রদায়। সাবেক মন্ত্রী, মেয়র, সেনা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে তেল ও দুর্নীতির অর্থে ধনী হয়ে ওঠা বহু মানুষ মাদ্রিদের সালামানকা এলাকায় স্থায়ী হয়েছেন। এলাকাটি অনেকের কাছে এখন ছোট কারাকাস নামে পরিচিত। বিরোধী নেতা ইসমাইল গার্সিয়ার ভাষায়, মাদ্রিদই এখন সেই জায়গা যেখানে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
মাদুরো ধরা পড়লেও ধাক্কা
মাদুরো আটক হওয়ার খবরে প্রথমে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও দ্রুতই বাস্তবতা সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মাদুরোর কট্টর উপ সভাপতি ডেলসি রদ্রিগেসকেই কার্যকর ক্ষমতায় রেখে দেয়। এতে অনেক নির্বাসিত মনে করেন, তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। রক্ষণশীল শিবিরের কেউ কেউ সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে জোরালো প্রচার চালালেও বাস্তবে ক্ষমতার রাশ রয়ে গেছে পুরনো কাঠামোর হাতেই।\

আনন্দের বদলে অস্বস্তি
স্পেনে পরিচিত লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব বরিস ইসাগিরে মনে করেন, এই সময়টা ভেনেজুয়েলার ডানপন্থীদের জন্য সুখের নয়। তার ভাষায়, দেশে ফিরে সাহায্য করার স্বপ্নে যারা শ্যাম্পেন খুলেছিলেন, তাদের আনন্দ দ্রুত ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এখন আলোচনায় আসছে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কথা, যেখানে আদর্শের চেয়ে নিরাপত্তাই বড় বিষয়।
ধীরে রূপান্তরের তর্ক
নির্বাসিতদের ভেতর ছড়িয়ে পড়া বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণ যেহেতু এখনো পুরনো গোষ্ঠীর হাতে, তাই ধীরে রূপান্তর ই একমাত্র পথ। সাবেক মন্ত্রী কার্লোস তাবলান্তের মতে, কারাকাসের কারাগারে থাকার চেয়ে মাদ্রিদে থেকে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পালন করাই বেশি কার্যকর।
স্পেন ও ভেনেজুয়েলার পুরনো সম্পর্ক
ফ্রাঙ্কোর শাসনামলে বহু স্প্যানিয়ার্ড আশ্রয় নিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলায়। পরে উল্টো স্রোত শুরু হয় হুগো চাভেজ ও তার উত্তরসূরি মাদুরোর সময়ে। জাতীয়করণ ও সমাজতন্ত্র নীতির ফলে স্পেনের তেল ও ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর ধনী ভেনেজুয়েলারা স্পেনকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন। মাদুরোর শাসনে সেই স্রোত আরও বেড়েছে।
মাদ্রিদে রাজনীতি ও ভয়
সালামানকার এক রেস্তোরাঁকে অনেকে নির্বাসিতদের অলিখিত দূতাবাস বলেন। সেখানে পনির ভরা নাশতার পাশে চলে রাজনীতির আলোচনা, আবার ভেতরে ভেতরে কাজ করে ভয়। রেস্তোরাঁ মালিক ইয়োহানা ফন মিলার ক্লিংস্পর বলেন, এই সময়টা যেন একসঙ্গে উৎসব আর আতঙ্কের।
ফিরে যাওয়ার শর্ত
অনেকেই স্পষ্ট করে বলেছেন, গণতন্ত্র নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ফিরবেন না। সাংবাদিক আলেসান্দ্রো দি স্তাসিও জানান, মাদুরোর পতনে তিনি খুশি হলেও নিজের নাম প্রকাশে এখনো সতর্ক। নির্বাসিতদের কণ্ঠই দেশের বাইরে ভেনেজুয়েলার আসল কণ্ঠ বলে মনে করেন বন্দি আইনজীবীর স্ত্রী মারিয়া কস্তানজা চিপ্রিয়ানি। তাদের মতে, এই কণ্ঠই একদিন দেশের ভেতরের পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















