হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রথম বছর শেষ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক অর্থনীতি নিয়ে, যা বাহ্যত আগের অবস্থার কাছাকাছি রয়ে গেছে। বেকারত্ব কম, ভোক্তা ব্যয় শক্তিশালী এবং মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে। শেয়ারবাজারও নানা ওঠানামার পর মোটের উপর ইতিবাচক লাভ দেখিয়েছে। এসব সূচক দেখে অনেকের মনে হতে পারে, ট্রাম্পের নীতিতে অর্থনীতির তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করছেন, এই স্বস্তির আড়ালে জমছে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।
প্রতিষ্ঠান ও নীতিকাঠামোতে চাপ
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ট্রাম্প এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত প্রতিষ্ঠান ও নীতি কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান সংস্থার নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ হয়েছে, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার, করপোরেট নেতাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ এবং অভিবাসন কঠোর করার মতো সিদ্ধান্তও এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপ একত্রে অর্থনীতিকে কম গতিশীল, আর্থিক ব্যবস্থাকে কম স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তুলনামূলকভাবে কম সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার এক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ করে তুলেছে যে উপাদান গুলো, সেগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে।
ডান ও বামের একমত হওয়া আশঙ্কা
এই উদ্বেগ শুধু এক রাজনৈতিক ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কাজ করা কিছু অর্থনীতিবিদ ও স্বীকার করছেন, বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতির কড়াকড়ি, বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মিলিয়ে সামগ্রিক প্রভাব নেতিবাচক। তাদের মতে, লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী।
এই ক্ষতি তাত্ক্ষণিক কোনো ধাক্কা হিসেবে নাও আসতে পারে। বরং ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, সুদের হার বেশি থাকা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার মাধ্যমে এর প্রভাব টের পাওয়া যেতে পারে। বড় কোনো সংকট এলে তা আসতে পারে বহু বছর পর, যখন দায় নির্ধারণ করার সুযোগও আর থাকবে না।
ভোটারদের অস্বস্তি ও দৈনন্দিন ব্যয়
স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ট্রাম্প প্রশাসন জীবনযাত্রার ব্যয়ের মূল সমস্যাগুলোতে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। আবাসন, শিশু পরিচর্যা কিংবা স্বাস্থ্যবিমার খরচ নিয়ে বড় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত এসেছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেই দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভোক্তা মনোভাব জরিপে দেখা গেছে, শুল্কনীতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চাকরির বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তা। বেকারত্ব খুব বেশি না বাড়লেও নিয়োগের গতি কমেছে, আর নতুন কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মানুষের অনুভূতি জোরালো হচ্ছে। উচ্চ দামের সঙ্গে আয়ের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এই উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের সতর্কতা
ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, তার নীতির সুফল পেতে সময় লাগবে। উচ্চ শুল্ক ও কম অভিবাসনের বাস্তবতায় কোম্পানিগুলোকে নতুন কৌশল সাজাতে হবে, তারপর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। তবে বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ এ নিয়ে আশাবাদী নন।
তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়া, লাগামছাড়া বাজেট ঘাটতি এবং গবেষণা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ কমে যাওয়া। এসবের ফলে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে, সরকারি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হতে পারে এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে।
তাৎক্ষণিকভাবে মন্দার আশঙ্কা না থাকলেও, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা সমস্যার ফল হঠাৎ করেই সামনে আসতে পারে। তাদের ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদ আসতে দেরি হয়, কিন্তু এলে তার গতি হয় বিস্ময়কর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















