এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে কুর্দি যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছে, আজ তাদের দিকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র এবার সমর্থন দিচ্ছে সিরিয়ার নতুন সরকারের হাতে, যার ফলে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
আইএস বিরোধী লড়াইয়ে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস। মার্কিন ঘাঁটি পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে হাজার হাজার জঙ্গি ও তাদের পরিবারকে আটক রাখার দায়িত্ব ছিল এই বাহিনীর ওপর। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠ জোট এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থানের ফলে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সেনা মোতায়েন শুরু করেছে এবং কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো দখল নিচ্ছে।

ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন
এই পরিবর্তন সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে এক বড় মোড়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর দেশকে একত্রিত করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন আহমেদ আল শারা। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মোড় ঘোরানো তার জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি তুরস্কেরও কূটনৈতিক জয়, যারা দীর্ঘদিন ধরেই কুর্দি বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল।
অন্যদিকে কুর্দি শিবিরে এই সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বহু মার্কিন কর্মকর্তা, যারা সরাসরি এই বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন, তারা এই অবস্থানে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন। তাদের যুক্তি, হাজার হাজার যোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে গড়ে ওঠা এই জোটকে এভাবে ছেড়ে দেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
কুর্দি বাহিনীর উত্থান ও বিতর্ক
আইএসের উত্থানের ভয়াবহ সময়ে কুর্দি মিলিশিয়াদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে যুক্তরাষ্ট্র। কোবানি শহর রক্ষায় অস্ত্র সহায়তা থেকে শুরু করে আর্থিক ও সামরিক সমর্থনের মাধ্যমে এই বাহিনী ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। পরে আরব যোদ্ধাদের যুক্ত করে তারা নিজেদের নাম দেয় সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস।
এই বাহিনীর নেতৃত্বে আইএসের তথাকথিত খেলাফতের পতন ঘটে। কিন্তু তাদের কুর্দি আধিপত্য আর তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যোগসূত্র নিয়ে বরাবরই বিতর্ক ছিল। তুরস্ক তাদের সরাসরি কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখে এসেছে।
নতুন সরকারের সঙ্গে ব্যর্থ সমঝোতা
আসাদ সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করেছিল কুর্দি বাহিনী ও নতুন সিরিয়ান সরকারের মধ্যে সমঝোতা করাতে। মার্কিন দূত থমাস ব্যারাকের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি ও হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কুর্দি বাহিনী তাদের অস্ত্র ও প্রশাসন দামেস্কের নিয়ন্ত্রণে দিতে ব্যর্থ হয়।
এরপর ধৈর্য হারিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নেয় নতুন সরকার। আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা থেকে শুরু করে রাক্কা ও দেইর আল জোর পর্যন্ত দ্রুত অগ্রসর হয় সরকারি বাহিনী। বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রযাত্রার পেছনে তুরস্ক, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছে।
ওয়াশিংটনের বার্তা ও উদ্বেগ
মার্কিন দূতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য, যেখানে কুর্দি বাহিনীর ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, কুর্দিদের মধ্যে আরও হতাশা তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও একদিকে নতুন সিরিয়ান সরকারের প্রশংসা করলেও অন্যদিকে কুর্দিদের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কুর্দিরা নিজেদের স্বার্থেই লড়েছে।
এই অবস্থার মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে হাসাকাহ থেকে শতাধিক আইএস বন্দিকে ইরাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, নতুন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















