০৯:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে ‘দ্য ওডিসি’ প্রচারে দেবী-প্রেরণার সাজে জেনডায়া, ফ্যাশনে চরিত্রের ভাষা কঙ্গোয় ইবোলা চিকিৎসায় প্রথম ট্রায়াল শুরু, ১৪০০ জন আক্রান্ত অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করতে দিল না মিয়ানমার জান্তা থাই বিমানসেবিকার মাধ্যমে হেরোইন পাচার, উৎস মিয়ানমার সন্দেহ পঁচিশ বছর পর তাইওয়ান সেনায় ফিরল কমিউনিস্ট বিরোধী শিক্ষা আমির খানের ব্যক্তিগত আয়োজনে বিয়ে, গৌরী স্প্রাটের সঙ্গে নতুন অধ্যায় এআই এখনো বাস্তব পৃথিবী বোঝে না, গবেষকদের নতুন সতর্কবার্তা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু, বাংলা সাহিত্য ও চিন্তাজগতে শূন্যতা তাইওয়ানের পূর্বে চীনা কোস্টগার্ডের দ্বিতীয় টহল, তাইপের প্রতিবাদ

বিজ্ঞানকে আজ নয়, ভবিষ্যতের চোখে দেখতে হবে: স্বল্পমেয়াদি চিন্তার বাইরে যাওয়ার ডাক

মানবসভ্যতা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও আমাদের চিন্তার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রিয়াম্ভাদা নটরাজনের মতে, আমরা এখন কেবল নিজেদের জীবদ্দশার লাভ ক্ষতির হিসাবেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবার মানসিকতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি। এই স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় ফিরতে না পারলে বিজ্ঞান, সমাজ ও পৃথিবী—তিনটিরই ক্ষতি অনিবার্য।

মহাকাশ গবেষণার স্বর্ণযুগের পেছনের কারণ
গত দুই দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিদ্যায় যে বিপ্লব ঘটেছে, তার মূল শক্তি এসেছে ভাবনা ও প্রযুক্তির যুগলবন্দি থেকে। হাবল, চন্দ্র এবং জেমস ওয়েবের মতো শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা ছাড়াই মহাকাশ থেকে তথ্য সংগ্রহের ফলে গবেষণার গতি ও গভীরতা দুটোই বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রগতি, সমান্তরাল গণনা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী চিপ, যা মহাবিশ্বের বিশাল অংশ অনুকরণ করে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি করেছে।

ডার্ক ম্যাটার ও কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য
কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে সাধারণ মানুষের কিছুটা ধারণা থাকলেও ডার্ক ম্যাটার এখনো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধা গুলোর একটি। আমরা জানি এটি মহাবিশ্বে কীভাবে প্রভাব ফেলে, কিন্তু এটি আসলে কী দিয়ে তৈরি—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। আলো, বিকিরণ বা শক্তির কোনো তরঙ্গের সঙ্গেই এর মিথস্ক্রিয়া নেই, কেবল মহাকর্ষের মাধ্যমেই এর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এটি প্রাথমিক মহাবিশ্বে সৃষ্ট কোনো কণার রূপ, যার প্রকৃতি উদ্ঘাটনই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ ও অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার
বিজ্ঞানের অগ্রগতি সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। হঠাৎ ঘটে যাওয়া উপলব্ধি, আকস্মিক সংযোগই অনেক সময় বড় আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব যে চূড়ান্ত নয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। মহাকর্ষের ক্ষুদ্র স্তরের ব্যাখ্যা এখনো অসম্পূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বর, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি—এই তিন ক্ষেত্রেই বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে আশাবাদী নটরাজন।

Astrophysicist Priyamvada Natarajan: 'There is an overall obsession with  just our lifetime, without thinking about future generations… We need to  move from this short-termism' | Idea Exchange News - The Indian Express

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব সৃজনশীলতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সমাজ ও বিজ্ঞানে বড় রকমের রূপান্তর আনবে, তা প্রায় নিশ্চিত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এটি কি মানুষের সৃজনশীল চিন্তার শেষ ধাপটি ছুঁতে পারবে। গবেষণার প্রক্রিয়াকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এর আছে, কিন্তু মানব মনের সেই অদৃশ্য সৃজনশীল লাফটি অনুকরণ করা আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

গবেষণা পরিবেশ ও ভারতের সুযোগ
ভারতের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার। মেধার কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু দরকার একটি সক্রিয় গবেষণা প্রতিবেশ, যেখানে প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা এবং দ্রুত অবকাঠামোগত সহায়তা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বিভিন্ন দেশের গবেষক একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান, যা নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। ভারতে সেই পরিবেশ গড়ে উঠলে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সম্ভব।

সরকারি অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিজ্ঞানের জন্য সরকারি অর্থায়ন অপরিহার্য বলে মনে করেন নটরাজন। দাতব্য সংস্থা বা ধনীদের ভূমিকা থাকলেও মৌলিক গবেষণার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সময়রেখা কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিকিয়ে রাখা যায় না। রাজনীতির চক্রের বাইরে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগই পারে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে।

স্বল্পমেয়াদি মানসিকতা থেকে মুক্তির আহ্বান
সমাজ হিসেবে আমরা এখন তাৎক্ষণিক লাভের পেছনে ছুটছি। প্রযুক্তি ও যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলেই পরিবেশ, সম্পদ ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বে আমরা উদাসীন হয়ে পড়ছি। এই প্রবণতা বদলাতে হলে বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্ত চিন্তা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে

বিজ্ঞানকে আজ নয়, ভবিষ্যতের চোখে দেখতে হবে: স্বল্পমেয়াদি চিন্তার বাইরে যাওয়ার ডাক

১০:০২:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

মানবসভ্যতা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও আমাদের চিন্তার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রিয়াম্ভাদা নটরাজনের মতে, আমরা এখন কেবল নিজেদের জীবদ্দশার লাভ ক্ষতির হিসাবেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবার মানসিকতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি। এই স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় ফিরতে না পারলে বিজ্ঞান, সমাজ ও পৃথিবী—তিনটিরই ক্ষতি অনিবার্য।

মহাকাশ গবেষণার স্বর্ণযুগের পেছনের কারণ
গত দুই দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিদ্যায় যে বিপ্লব ঘটেছে, তার মূল শক্তি এসেছে ভাবনা ও প্রযুক্তির যুগলবন্দি থেকে। হাবল, চন্দ্র এবং জেমস ওয়েবের মতো শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাধা ছাড়াই মহাকাশ থেকে তথ্য সংগ্রহের ফলে গবেষণার গতি ও গভীরতা দুটোই বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রগতি, সমান্তরাল গণনা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী চিপ, যা মহাবিশ্বের বিশাল অংশ অনুকরণ করে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি করেছে।

ডার্ক ম্যাটার ও কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য
কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে সাধারণ মানুষের কিছুটা ধারণা থাকলেও ডার্ক ম্যাটার এখনো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধা গুলোর একটি। আমরা জানি এটি মহাবিশ্বে কীভাবে প্রভাব ফেলে, কিন্তু এটি আসলে কী দিয়ে তৈরি—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। আলো, বিকিরণ বা শক্তির কোনো তরঙ্গের সঙ্গেই এর মিথস্ক্রিয়া নেই, কেবল মহাকর্ষের মাধ্যমেই এর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, এটি প্রাথমিক মহাবিশ্বে সৃষ্ট কোনো কণার রূপ, যার প্রকৃতি উদ্ঘাটনই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ ও অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার
বিজ্ঞানের অগ্রগতি সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। হঠাৎ ঘটে যাওয়া উপলব্ধি, আকস্মিক সংযোগই অনেক সময় বড় আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব যে চূড়ান্ত নয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। মহাকর্ষের ক্ষুদ্র স্তরের ব্যাখ্যা এখনো অসম্পূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বর, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি—এই তিন ক্ষেত্রেই বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বলে আশাবাদী নটরাজন।

Astrophysicist Priyamvada Natarajan: 'There is an overall obsession with  just our lifetime, without thinking about future generations… We need to  move from this short-termism' | Idea Exchange News - The Indian Express

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানব সৃজনশীলতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সমাজ ও বিজ্ঞানে বড় রকমের রূপান্তর আনবে, তা প্রায় নিশ্চিত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এটি কি মানুষের সৃজনশীল চিন্তার শেষ ধাপটি ছুঁতে পারবে। গবেষণার প্রক্রিয়াকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এর আছে, কিন্তু মানব মনের সেই অদৃশ্য সৃজনশীল লাফটি অনুকরণ করা আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

গবেষণা পরিবেশ ও ভারতের সুযোগ
ভারতের সামনে এখন বড় সুযোগ রয়েছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার। মেধার কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু দরকার একটি সক্রিয় গবেষণা প্রতিবেশ, যেখানে প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা এবং দ্রুত অবকাঠামোগত সহায়তা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বিভিন্ন দেশের গবেষক একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান, যা নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। ভারতে সেই পরিবেশ গড়ে উঠলে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সম্ভব।

সরকারি অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিজ্ঞানের জন্য সরকারি অর্থায়ন অপরিহার্য বলে মনে করেন নটরাজন। দাতব্য সংস্থা বা ধনীদের ভূমিকা থাকলেও মৌলিক গবেষণার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সময়রেখা কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিকিয়ে রাখা যায় না। রাজনীতির চক্রের বাইরে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগই পারে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে।

স্বল্পমেয়াদি মানসিকতা থেকে মুক্তির আহ্বান
সমাজ হিসেবে আমরা এখন তাৎক্ষণিক লাভের পেছনে ছুটছি। প্রযুক্তি ও যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলেই পরিবেশ, সম্পদ ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বে আমরা উদাসীন হয়ে পড়ছি। এই প্রবণতা বদলাতে হলে বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্ত চিন্তা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিকে সমাজের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।