২০২৬ সালের শুরুতেই আবার চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডলার। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। ওয়াশিংটনের দুর্বল মুদ্রানীতির ইঙ্গিত, ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত সিদ্ধান্ত এবং বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মিলিয়ে ডলারকে ঘিরে যে স্থিতিশীলতার আশা ছিল, তা ভেঙে পড়ছে।
ডলারের বড় ধসের ইঙ্গিত
সোমবার প্রধান বৈশ্বিক মুদ্রার ঝুঁড়ির বিপরীতে ডলার তিন দিনের ব্যবধানে বড় ধরনের পতনের পথে ছিল। গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্পের তথাকথিত মুক্তির দিনের শুল্ক ঘোষণার পর যেমন মার্কিন সম্পদে বড় বিক্রি দেখা গিয়েছিল, এবারের পরিস্থিতিও অনেকটা সেরকম বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। চলতি বছর ইউরো, পাউন্ড ও সুইস ফ্রাঁর মতো মুদ্রার তুলনায় ডলার স্পষ্টভাবেই পিছিয়ে রয়েছে।

ট্রাম্প নীতির প্রভাব
ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরে ট্রাম্পের অনিয়মিত বাণিজ্যনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর চাপ ডলারকে দুর্বল করেছে। সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্তও পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। এর ফল হিসেবে গত বছর ডলারের মূল্য ৯ শতাংশের বেশি কমে, যা ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স।
বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল
বিশ্বব্যাপী সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা বলছেন, এটি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা না হলেও বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। অর্থনৈতিক ভিত্তি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত এমনভাবে একত্র হচ্ছে, যা ডলারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের কথা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত এবং ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত অভিযান বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।
বাজারে অস্থিরতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ
বাজারে অস্থিরতার সূচক এখনো উঁচুতে রয়েছে। জাপানের সরকারি ঋণপত্রে বড় ধরনের বিক্রি মার্কিন ট্রেজারির ওপরও চাপ ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে স্বর্ণের দাম বারবার নতুন রেকর্ড ছোঁয়া দেখাচ্ছে, যা নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প খোঁজার ইঙ্গিত দেয়।
সরকারি অচলাবস্থার শঙ্কা
দেশের ভেতরে অবৈধ অভিবাসন দমনে কঠোর অভিযানের ফলে উত্তেজনা ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এতে আবারও সরকারি কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা ডলারের ওপর আরও চাপ বাড়াচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বা ডলার ঝুঁকি কমানোর সিদ্ধান্তে ঠেলে দিচ্ছে।
সুদের হার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা
এ বছর অন্তত দুই দফা সুদ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে বাজারের ধারণা। অন্যদিকে অনেক বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয় সুদ স্থির রাখছে, নয়তো বাড়ানোর কথা ভাবছে। ফলে তুলনামূলকভাবে ডলার কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনাও ডলারের দুর্বলতায় ভূমিকা রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বৈচিত্র্যের পথে বিশ্ব
বিশ্ব শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে উল্লাস থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। এশিয়ার বড় বাজারগুলো অনেক দ্রুত বেড়েছে। এতে সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি।
ভূরাজনীতি বনাম অর্থনীতি
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারের পার্থক্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলো আগের মতো শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বেশি ভূরাজনৈতিক ও সংঘাতমুখী। এ কারণেই ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ গভীর হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















