বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন হাইব্রিড ডাক ভোট ব্যবস্থা নতুন আশা তৈরি করেছে। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে অবস্থানকারী ভোটারদের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও, বাস্তবে আবারও ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বাদ পড়ছেন দেশের বহু সাংবাদিক।
পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট পেশাজীবীর জন্য ডাক ভোটের ব্যবস্থা চালু করেছে নির্বাচন কমিশন। এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকার, নির্বাচন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এবং কারাগারে থাকা ভোটাররা, যারা ভোটের দিন নিজ নিজ এলাকায় উপস্থিত থাকতে পারেন না।
কিন্তু নির্বাচনী কাভারেজের জন্য বিভিন্ন জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে। অথচ নির্বাচনকালে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তারাই। ফলে বহু সাংবাদিক আসন্ন নির্বাচনেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না, যা বছরের পর বছর ধরে চলমান এক বাস্তবতা।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন ডাক ভোট ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। পোস্টাল বিডি অ্যাপের মাধ্যমে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশে অবস্থানরত ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন ভোটার রয়েছেন, যারা ভোটের দিন দায়িত্ব পালনের কারণে নিজ এলাকায় থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী ভোটার।
নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিকদের বক্তব্য, ডাক ভোটের সুবিধা কেবল কয়েকটি পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা অনুচিত। পেশাগত দায়িত্বের কারণে যারা ভোটের দিন নিজ এলাকায় থাকতে পারেন না, বিশেষ করে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা বাড়ানো উচিত বলে তারা মনে করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, সরকারের নতুন ডাক ভোট ব্যবস্থা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও সাংবাদিকদের এতে অন্তর্ভুক্ত না করা দুঃখজনক। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা কার্যত নিজের দেশেই প্রবাসীর মতো অবস্থায় থাকেন। যখন নির্বাচন দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যরা ভোটের সুযোগ পাচ্ছেন, তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন বৈষম্য কেন করা হচ্ছে—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, নির্বাচন কাভারেজে বাইরে থাকা সাংবাদিকরা ভোট দেওয়ার সুযোগ হারান। নতুন ডাক ভোট ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সাংবাদিকদেরও এর আওতায় আনা উচিত। তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বিষয়টিকে বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরও সাংবাদিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা দুঃখজনক। দেশের ও জনগণের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করেও ভোট দিতে না পারা অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যরা যখন ভোট দিতে পারেন, তখন সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
রাজধানীর বাইরেও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। খুলনা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক ও দৈনিক ইত্তেফাকের খুলনা ব্যুরো প্রধান এনামুল হক জানান, খুলনায় প্রায় সব সাংবাদিকই ভোটের দিন পেশাগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে অন্য এলাকায় নিবন্ধিত সাংবাদিকরা ইচ্ছা থাকলেও ভোট দিতে পারেন না। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং জানান যে আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে ইতোমধ্যে বিষয়টি তোলা হয়েছে।
চট্টগ্রামে প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ-এর আঞ্চলিক প্রধান জাহিদুল করিম বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে নিজ নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত প্রকৃত সাংবাদিকদের ডাক ভোটের আওতায় আনতে পারত।
এর আগে নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের জন্য ডাক ভোটের ব্যবস্থা করার ইঙ্গিত দিলেও পরে জানায়, বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা হবে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসুদ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটে নতুন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডাক ভোট ব্যবস্থা সফল হলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকসহ অন্যান্য গোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থায় নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো মূল্যায়নের পর পরিধি বাড়ানো হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের জন্য বর্তমানে যে প্রতিনিধি ভোট ব্যবস্থা চালু রয়েছে, জনমত অনুকূলে থাকলে ভবিষ্যতে ডাক ভোটের পাশাপাশি সেই ব্যবস্থাও চালুর কথা ভাবতে পারে কমিশন।
তবে আপাতত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচন কাভারেজে নিয়োজিত সাংবাদিকরা ভোটের মাঠের বাইরে থেকেই গণতন্ত্রের খবর তুলে ধরছেন—নিজেরা অংশ নিতে না পেরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















