এক দশকেরও কম বয়সে প্রাণ হারালেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে মিলার নাম। দুই হাজার একুশ সালে অতি বিরল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় শিশু মিলা মাকোভেক। তাকে বাঁচানো না গেলেও বিশ্বের প্রথম একক রোগীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই অধ্যায় থেমে থাকেনি মিলার মৃত্যুর পরও।
মিলার মা জুলিয়া ভিটারেলো মেয়ের রোগ শনাক্ত হওয়ার পরই গড়ে তুলেছিলেন ‘মিলাস মিরাকল ফাউন্ডেশন’। লক্ষ্য ছিল মেয়ের জন্য চিকিৎসা খুঁজে বের করা এবং সেই চিকিৎসার অর্থ জোগানো। বোস্টনের শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের একটি অণু, যা স্নায়বিক রোগে ব্যবহৃত হয়। মিলা মারা যাওয়ার পর ভিটারেলো উদ্যোগ নেন যেন ভবিষ্যতে অতি বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত অন্য শিশুদের জন্য দ্রুত ও সহজভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ওষুধ তৈরি করা যায়।
অতি বিরল রোগ বলতে বোঝায় এমন অসুখ, যা প্রতি পঞ্চাশ হাজার মানুষের মধ্যে একজনেরও কমকে আক্রান্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগ একেবারেই অনন্য। ফলে সমস্যার মতো সমাধানও হতে হয় আলাদা। এই বাস্তবতা থেকেই ভিটারেলো যুক্তরাষ্ট্র ও পরে যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। একই সঙ্গে বোস্টনে গড়ে তোলেন একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য ছিল এই ধরনের ওষুধ বৃহৎ পরিসরে তৈরির পথ খুঁজে বের করা।

নিয়ম বদলে চিকিৎসার নতুন অধ্যায়
চলতি বছরের তেরো জানুয়ারি যুক্তরাজ্যে এই প্রচেষ্টায় বড় সাফল্য আসে। সরকারি ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মে পরিবর্তনের পর লন্ডনের একটি শিশু হাসপাতালে ‘রোগী এ’ নামে পরিচিত এক কিশোরীকে অতি বিরল স্নায়বিক রোগের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওষুধ দেওয়া হয়। এটি আর একক প্রয়োগ নয়, বরং একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগের অংশ, যার লক্ষ্য এই ধরনের চিকিৎসাকে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একই কাঠামোর মধ্যে একাধিক অতি বিরল ও প্রাণঘাতী স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করা যাবে। এতে আলাদা আলাদা ওষুধ নয়, বরং ওষুধ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিই যাচাই করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের ভাষায়, এটি জিনগত রোগের চিকিৎসায় এক উত্তেজনাপূর্ণ ভবিষ্যতের শুরু।
কীভাবে কাজ করে এই ওষুধ
রোগী এ যে রোগে আক্রান্ত, তাতে মস্তিষ্কের কোষ থেকে অতিরিক্ত চর্বি ও রাসায়নিক উপাদান বের হয়ে যেতে পারে না। ফলে সেগুলো জমে কোষ ধ্বংস করে দেয় এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক ক্ষয়ে যায়। এর ফলে খিঁচুনি, হঠাৎ পেশিশক্তি হারানো এবং স্মৃতি ও শেখার সমস্যায় ভোগে শিশুটি। চিকিৎসা না হলে এই রোগ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়।
এই নতুন ওষুধ শরীরের ভেতরে জিনগত বার্তা বহনকারী অণুর কার্যক্রম বদলে দেয়। এতে ভুল বার্তাটি আড়াল হয়ে যায় এবং শরীর আবার স্বাভাবিক প্রোটিন তৈরি করতে পারে। চিকিৎসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রোটিন তৈরি শুরু হলেও এর পূর্ণ উপকার পেতে সময় লাগবে, কারণ জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদান পরিষ্কার হতে হবে।
এক কাঠামোয় বহু রোগের চিকিৎসা
নতুন ব্যবস্থায় তথ্য সংগ্রহ, নিরাপত্তা যাচাই এবং ওষুধ শরীরে কীভাবে কাজ করছে তা মাপার নির্দিষ্ট নিয়ম ঠিক করা হয়েছে। কেবল প্রাণঘাতী বা জীবনসংকটজনক স্নায়বিক রোগই এর আওতায় আসবে। একই ধরনের কাঠামো ব্যবহার করে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের জন্য ওষুধ তৈরি করা যাবে। লক্ষ্য হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিয়ে ভবিষ্যতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

একক রোগীর জন্য তৈরি ওষুধে প্রচলিত পরীক্ষার নিয়ম প্রয়োগ করা কঠিন। নতুন এই পদ্ধতিতে ঝুঁকি থাকলেও চিকিৎসা না পেলে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পড়তে হয় রোগীদের। তাই এই ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সফল হলে এটি শুধু স্নায়বিক রোগ নয়, অন্যান্য বিরল রোগের চিকিৎসার পথও খুলে দেবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জনস্বাস্থ্য
এই উদ্যোগের আরেকটি বড় দিক হলো তথ্য ভাগাভাগি। এতে ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠানও এই ধারণার ওপর কাজ করতে পারবে। ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রেও অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভিটারেলো এখন নিজ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদে এই চিকিৎসার অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই চিকিৎসা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। আলাদা আলাদা করে বিরল হলেও সম্মিলিতভাবে এসব রোগের চাপ কম নয়। নিয়মিত চিকিৎসা সম্ভব হলে নবজাতকের জিনগত পরীক্ষা করে আগেই রোগ শনাক্ত করা যেতে পারে। এতে অল্প বয়সেই চিকিৎসা শুরু করে শিশুদের স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমানে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ওষুধ তৈরি করতে কয়েক বছর সময় ও বিপুল খরচ লাগে। নতুন পদ্ধতিতে সময় ও খরচ দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এতে অতি বিরল রোগও ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। প্রথম দফায় চিকিৎসা পাওয়া শিশুদের জন্য এই ওষুধই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র আশার আলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















