ইরানের রাজধানী তেহরানের বেহেশতে জাহরা কবরস্থানে জানুয়ারির শুরুতে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারগুলোর জন্য ছিল এক ভয়াল দুঃস্বপ্ন। একের পর এক লাশ স্তূপ করে রাখা হয়েছে, এমন ভাবে যে জীবিত মানুষদের পা ফেলতেও সাবধান হতে হয়েছে। স্বজনরা হাহাকার করতে করতে মরদেহের ব্যাগে ঝুলানো নম্বর খুঁজেছেন, যেন প্রশাসনিক নিয়মের এক নিষ্ঠুর ছাপ পড়েছে এই মানবিক বিপর্যয়ের ওপর।
লাশের স্তূপ আর ভেঙে পড়া মানুষেরা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শীতলীকরণ ট্রাকে করে আরও লাশ এনে মাটিতে ফেলে দেওয়া হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্তান, ভাই, মা-বাবার দাফনের জন্য আসা মানুষের সামনে লাশ ফেলে দেওয়ার সেই মুহূর্ত অনেককেই মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। এক মা সন্তানের দেহ আঁকড়ে ধরে অনুনয় করছিলেন, যেন তাকে এভাবে কোথাও ছুড়ে না ফেলা হয়।
এই দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। মর্গের ভেতরে ঢুকে তারা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে, যা দেশটিতে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য। নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থাকলেও প্রথমে হস্তক্ষেপ করেনি। তবে কেউ মোবাইলে ভিডিও করতে গেলেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

দমন-পীড়নের ভয়াবহ মূল্য
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সরকার ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ বন্ধ করে রাখায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা দীর্ঘদিন আড়ালেই থেকে গেছে। ধীরে ধীরে যে তথ্য সামনে আসছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে নিহতের সংখ্যা বর্তমান হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিভিন্ন শহরের মর্গ ও কবরস্থানে লাশ জমে থাকার অসংখ্য সাক্ষ্য তারা সংগ্রহ করেছে।
তেহরান ও রাশতসহ একাধিক শহরে লাশ একটির ওপর আরেকটি ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও পরিবারগুলোকে ট্রাকভর্তি মরদেহের ভেতর থেকে নিজের স্বজন খুঁজতে বাধ্য করা হয়েছে। আবার দরিদ্র এলাকায় নিহত বিক্ষোভকারীর দেহ ফেরত পেতে পরিবারের কাছে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নীরবতার চাপে শোক
চিকিৎসক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম দশ দিনে কেবল একটি শহরেই ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। এখন এমন পরিবার নেই যারা কাউকে হারায়নি। চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা যেন মৃত্যুর ধুলো বহন করছে।
বেহেশতে জাহরায় দাফনের সময়ও কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। স্বজনদের দ্রুত শেষ বিদায় জানাতে বাধ্য করা হয়েছে, কোথাও কোথাও নিরাপত্তা সদস্যরা সময় বেঁধে দিয়েছে। শিশুদের ছোট ছোট দেহের ব্যাগ অসতর্কভাবে ছুড়ে ফেলার দৃশ্য সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

দাফন নিয়েও নিয়ন্ত্রণ
অনেক পরিবারকে নিজ শহরে দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। শর্ত দেওয়া হয়েছে, কোনো সমাবেশ হবে না, নীরবে দাফন করতে হবে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দাফন ও শোকানুষ্ঠান সীমিত রাখা ইরানের পুরোনো কৌশল, কারণ কবরস্থানে অনেক সময় প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়।
বেহেশতে জাহরা ইরানিদের কাছে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে এমন নিষ্ঠুরতা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এই চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা দীর্ঘদিন টিকবে না। মানুষের ভেতরে যে ঘৃণা জমে উঠছে, তা আর কোনো শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















