০৬:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যা যা বদলে যাবে, নতুন যুক্ত হবে যেসব বিষয় করাচিতে ইতিহাসের চাকা ঘুরল ফ্রেয়ার হলে, দুর্লভ প্রাচীন গাড়ির প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের ঢল ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির নতুন অধ্যায়, নেতৃত্বে বাস্তববাদী তো লাম শ্রীনগরে তুষারঝড়ে আকাশপথ বন্ধ, বাতিল সব ফ্লাইট, অচল সড়ক ও রেল যোগাযোগ জুলাই আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি- কী অর্থ বহন করে? ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিধসের তাণ্ডব, নিখোঁজ ৪২ জনের মধ্যে এলিট মেরিন সদস্য, মৃত ১৭ সংস্কৃতি অবমাননার অভিযোগে রাজনীতির উত্তাপ, গামোছা পরা না-পরা নিয়ে মুখোমুখি বিজেপি–কংগ্রেস ক্যানসার সচেতনতায় ইতিহাস গড়তে আমিরাতে ক্যানসার রান দুই হাজার ছাব্বিশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পথে নতুন দিশা, বিদ্যুৎ গ্রিড রূপান্তরে একাডেমিক পাঠ্যবইয়ের ভূমিকা ফিলিস্তিনি মানবিক সংগঠন তাওউন পেল জায়েদ মানব ভ্রাতৃত্ব পুরস্কার, স্বীকৃতি পেল চার দশকের কাজ

‘তালিমের’ নারীরা চালাচ্ছেন জামায়াতের প্রচারণা, বিএনপির কর্মীরা চাচ্ছেন ‘ওয়াদা’

বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া সাড়ে ১২ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী, যাদের বড় অংশ আবার তৃণমূল পর্যায়ের।

নির্বাচনের পর কোন দল সরকার গঠন করবে তাতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে তৃণমূলের নারী ভোটাররা। আর তাই নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।

এক্ষেত্রে ধর্ম নিয়ে আলোচনার কথা বলে নারীদের জমায়েত বা তালিম করে অনেক আগে থেকেই নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের বিরুদ্ধে।

প্রচারণা শুরুর পর বিএনপির দিক থেকেও ধর্মকে ব্যবহার করে নারী ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করার বিষয়টি সামনে আসছে।

ফলে নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে ধর্মকে ব্যবহারের নজির সৃষ্টির আঙুল উঠছে দুই দলের দিকেই।

অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নারী ভোটারদের মধ্যে যেমন নানা ধরনের আশা-প্রত্যাশা আছে, তবে গণভোট নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা গেছে সংশয়।

জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা নিজ দলের প্রার্থীর জন্য ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথা

জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা নিজ দলের প্রার্থীর জন্য ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথা

সরেজমিনে নোয়াখালী পাঁচ আসনের প্রচারণা

২৪শে জানুয়ারি, দুপুর আড়াইটা। সাধারণত দুপুরের সময়টিকেই নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণার জন্য বেছে নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা। কারণ, সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে তখনই কিছুটা বিশ্রামের সময় পান ‘গেরস্ত’ নারীরা।

সরেজমিনে নোয়াখালীর নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুরে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি বাড়ি হেঁটে নিজেদের প্রার্থীর জন্য ভোট চাইছেন দলটির নারী কর্মীরা। পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথাও।

তবে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ধর্মকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। এমনকি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দাবি, অনেক আগে থেকেই ধর্ম নিয়ে আলোচনা বা তালিমের নামে নারীদের জড়ো করে চালানো হচ্ছে প্রচারণা, চাওয়া হচ্ছে বিকাশ ও এনআইডি নম্বর। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করছে তারা।

“কেন এসব অপপ্রচার করছে তারাই জানে। আমরা বিকাশ নাম্বার এইআইডি কেন নেবো, এটাতো আমাদের প্রয়োজন নাই”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মী তানজীমা আক্তার রিমা।

আগে তালিম করলেও নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর উপর মহলের নির্দেশনায় তা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করলেন তিনি। বললেন, “এখন আমরা বোনেরা প্রচারণায় নেমে যাব। এখন আর আমাদের তালিমের প্রয়োজন নেই”।

তবে তালিম করার সময় যারা তাদের কথাবার্তা পছন্দ করেছেন তাদের অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জামায়াতের নারী কর্মীদের ‘সঙ্গী’ হয়েছেন বলেও জানান মিজ রিমা।

“ওই বোনদের সাথে করে আমরা বের হইছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য – আমরা দুনিয়াতে তো পাইতেছি না, আমরা আখিরাতে পাবো। ওই কথা বলে ওই বোনগুলোকে নিয়ে আমরা বেরোই”, বলেন তিনি।

নারীদের কাছে পৌঁছাতে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির নারী কর্মীরাও

নারীদের কাছে পৌঁছাতে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির নারী কর্মীরাও

অনেকটা একইভাবে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নারী কর্মীদের কাজে লাগাচ্ছে স্থানীয় বিএনপিও। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণায় বলছেন প্রতীকের কথা, দিচ্ছেন নানা আশ্বাস। তবে শোনা যায়নি গণভোট নিয়ে কোনো আলাপ।

“এলাকাতে আমাদের ১২ জনের মহিলা টিম আছে। আমরা মহিলা টিমগুলো নিয়ে প্রতিটা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধানের শীষে তারেক রহমানের জন্য ভোট চাইছি”, বলছিলেন নেয়াজপুর ইউনিয়ন মহিলা দলের সভাপতি খতিজা বেগম।

একইসাথে জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মকে হাতিয়ার করার অভিযোগ তুলে প্রচারণার সময় সে বিষয়টি নিয়েও সচেতন করার কথা জানান তিনি। বলেন, “অনেক মহিলা গ্রামে গ্রামে তালিম করে জামায়াতে ভোট দিতে বলে। আমরা আবার এদের সচেতন করে বলি, জামায়াতে ভোট দিয়ে কেউ বেহেশতে যাইতে পারে না। আমার বেহেশত আমার লগে”।

নারীদের মধ্যে প্রচারণার সময় বিএনপির পুরুষ কর্মীরাও কখনো কখনো সাথে থাকেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা, যা জামায়াতের থেকে ব্যতিক্রম। তবে নারীদের মাঝে প্রচারণার সময় ধর্মের ব্যবহারে পিছিয়ে নেই বিএনপিও।

নিজেদের প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য নারীদের কাছ থেকে ‘ওয়াদা’ চাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়ে বিবিসির ক্যামেরায়।

আবার দলটির স্থানীয় পুরুষ সমর্থকদের স্ত্রীদের ভোটও বিএনপি পাবে, এমন বিশ্বাসের কথা জানান তৃণমূল বিএনপির এক নেতা। বলেন, যেহেতু সংসার করছে তাই তার কথার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই স্ত্রীর।

“কারণ আমি তার স্বামী। সে তো বেহেশত-দোযখ চেনে। এই সুবাদে যে যদি আমার নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাহলে সে তো জাহান্নামি হবে, আর আদেশ পালন করলে জান্নাতি হবে”, বলছিলেন নেয়াজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামাল উদ্দিন বাবুল।

একটি পুকুরের পাড়ে গাছাপালা ঘেরা রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছেন বোরকা পরা কয়েকজন নারী

বিএনপির নারী কর্মীরা ভোটারদের বলছেন প্রতীকের কথা, দিচ্ছেন নানা আশ্বাস

প্রচারণায় বাধা পাওয়ার অভিযোগ জামায়াতের

কেন্দ্র থেকে পাঠানো নির্দেশনা অনুসরণ করে তিনজনের ছোটো টিম করে কর্মীরা ভাগ হয়ে নারী ভোটারদের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানান স্থানীয় মহিলা জামায়াতের শূরা কর্মপরিষদ সদস্য খালেদা নার্গিস।

তবে ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা কোনো সমস্যার মুখোমুখি না হলেও বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানিয়েছেন দলটির নারী কর্মীরা।

গত বৃস্পতিবার জামায়াতের একজন কর্মীর বাড়িতে আয়োজিত নারীদের উঠান বৈঠককে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তাদের দাবি, বিএনপির অঙ্গসংগঠন যুবদলের একজন কর্মী সেই আয়োজনে বাধা দেন।

“আমাদের ভাইরা বললো ঘরোয়া কিছু করি, মহিলাদের দাওয়াত দেবেন। তারা আমাদের কথা শুনবে। প্রার্থীর সামনে ওরা (বিএনপির লোকজন) চিৎকার করছে। কয় যে কেন এখানে জামায়াতের কর্মীরা আসবে, ভিন্ন পুরুষ কেন আসবে,” বলছিলেন জামায়াতের কর্মী কামরুন্নাহার।

এছাড়াও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার সময়ও নানা ধরনের কটূক্তি ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন দলটির নারী কর্মীরা। যদিও সেসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা।

ওই ঘটনার বিষয়ে জানতে পারার পর জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের সাথে কথা বলে সমাধান করা হয়েছে বলে জানান মি. বাবুল।

গোলাপী রংয়ের শাড়ি মাথায় পেঁচানো ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম যিনি নোয়াখালী পাঁচ আসনের একজন ভোটার

নোয়াখালী পাঁচ আসনের ভোটার ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম

নারী ভোটারদের প্রত্যাশা আর সংশয়

নোয়াখালী পাঁচ আসনে মোট ভোটার আছে পাঁচ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ দুই লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন নারী ভোটার।

ফলে অন্য অনেক জায়গার মতো জাতীয় নির্বাচনে ওই আসনেরও জয় নির্ধারণে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নারী ভোটাররা।

আসনটির ভোটার ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম। নির্বাচন নিয়ে শুনছেন নানা আলাপ। প্রচারণায় গিয়ে তার কাছে ভোট চেয়েছে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা। দিয়েছেন নানা আশ্বাসও। কিন্তু তাতে খুব বেশি ভরসা করতে পারছেন না।

“আশ্বস্ত কইরে আংগোরে (আমাদের) রেশন দিবো, ওইটা দিবো, হেইটা দিবো। অন কন লাইগছে (এখন এসব বলছে)। হিয়ান বা দি দেয় না নো দেয় হেইটা হেতারা এ না জানে (পরে দেবে কি না সেটা তারাই জানে)। আমরা কেমনে জানি” বলছিলেন তিনি।

একইসাথে গণভোটে হ্যাঁ-না ভোট দেওয়ার বিষয়টিও তার কাছে পরিষ্কার না।

“হা কেনে দিবো, না কেনে দিবো? কিয়া কয়, হেই কতা বুজি না”।

একই আসনের ভোটার শাহিদা আক্তার লাভলী। এই গৃহিণী চান এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন।

নির্বাচনের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো হবে বলে আশা করছেন লাইলী বেগম, “বাড়িতে থাকা অনেক সমস্যা হয় – চোর ডাকাতের ভয়। এগুলা ভালো করলে হয় আর কি”।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যা যা বদলে যাবে, নতুন যুক্ত হবে যেসব বিষয়

‘তালিমের’ নারীরা চালাচ্ছেন জামায়াতের প্রচারণা, বিএনপির কর্মীরা চাচ্ছেন ‘ওয়াদা’

০৪:৫৬:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া সাড়ে ১২ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী, যাদের বড় অংশ আবার তৃণমূল পর্যায়ের।

নির্বাচনের পর কোন দল সরকার গঠন করবে তাতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে তৃণমূলের নারী ভোটাররা। আর তাই নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।

এক্ষেত্রে ধর্ম নিয়ে আলোচনার কথা বলে নারীদের জমায়েত বা তালিম করে অনেক আগে থেকেই নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের বিরুদ্ধে।

প্রচারণা শুরুর পর বিএনপির দিক থেকেও ধর্মকে ব্যবহার করে নারী ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করার বিষয়টি সামনে আসছে।

ফলে নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে ধর্মকে ব্যবহারের নজির সৃষ্টির আঙুল উঠছে দুই দলের দিকেই।

অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নারী ভোটারদের মধ্যে যেমন নানা ধরনের আশা-প্রত্যাশা আছে, তবে গণভোট নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা গেছে সংশয়।

জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা নিজ দলের প্রার্থীর জন্য ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথা

জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা নিজ দলের প্রার্থীর জন্য ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথা

সরেজমিনে নোয়াখালী পাঁচ আসনের প্রচারণা

২৪শে জানুয়ারি, দুপুর আড়াইটা। সাধারণত দুপুরের সময়টিকেই নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণার জন্য বেছে নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা। কারণ, সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে তখনই কিছুটা বিশ্রামের সময় পান ‘গেরস্ত’ নারীরা।

সরেজমিনে নোয়াখালীর নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুরে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি বাড়ি হেঁটে নিজেদের প্রার্থীর জন্য ভোট চাইছেন দলটির নারী কর্মীরা। পাশাপাশি বলছেন গণভোটের কথাও।

তবে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে ধর্মকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। এমনকি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দাবি, অনেক আগে থেকেই ধর্ম নিয়ে আলোচনা বা তালিমের নামে নারীদের জড়ো করে চালানো হচ্ছে প্রচারণা, চাওয়া হচ্ছে বিকাশ ও এনআইডি নম্বর। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করছে তারা।

“কেন এসব অপপ্রচার করছে তারাই জানে। আমরা বিকাশ নাম্বার এইআইডি কেন নেবো, এটাতো আমাদের প্রয়োজন নাই”, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মী তানজীমা আক্তার রিমা।

আগে তালিম করলেও নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর উপর মহলের নির্দেশনায় তা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করলেন তিনি। বললেন, “এখন আমরা বোনেরা প্রচারণায় নেমে যাব। এখন আর আমাদের তালিমের প্রয়োজন নেই”।

তবে তালিম করার সময় যারা তাদের কথাবার্তা পছন্দ করেছেন তাদের অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে জামায়াতের নারী কর্মীদের ‘সঙ্গী’ হয়েছেন বলেও জানান মিজ রিমা।

“ওই বোনদের সাথে করে আমরা বের হইছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য – আমরা দুনিয়াতে তো পাইতেছি না, আমরা আখিরাতে পাবো। ওই কথা বলে ওই বোনগুলোকে নিয়ে আমরা বেরোই”, বলেন তিনি।

নারীদের কাছে পৌঁছাতে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির নারী কর্মীরাও

নারীদের কাছে পৌঁছাতে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির নারী কর্মীরাও

অনেকটা একইভাবে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নারী কর্মীদের কাজে লাগাচ্ছে স্থানীয় বিএনপিও। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণায় বলছেন প্রতীকের কথা, দিচ্ছেন নানা আশ্বাস। তবে শোনা যায়নি গণভোট নিয়ে কোনো আলাপ।

“এলাকাতে আমাদের ১২ জনের মহিলা টিম আছে। আমরা মহিলা টিমগুলো নিয়ে প্রতিটা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধানের শীষে তারেক রহমানের জন্য ভোট চাইছি”, বলছিলেন নেয়াজপুর ইউনিয়ন মহিলা দলের সভাপতি খতিজা বেগম।

একইসাথে জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মকে হাতিয়ার করার অভিযোগ তুলে প্রচারণার সময় সে বিষয়টি নিয়েও সচেতন করার কথা জানান তিনি। বলেন, “অনেক মহিলা গ্রামে গ্রামে তালিম করে জামায়াতে ভোট দিতে বলে। আমরা আবার এদের সচেতন করে বলি, জামায়াতে ভোট দিয়ে কেউ বেহেশতে যাইতে পারে না। আমার বেহেশত আমার লগে”।

নারীদের মধ্যে প্রচারণার সময় বিএনপির পুরুষ কর্মীরাও কখনো কখনো সাথে থাকেন বলে জানিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা, যা জামায়াতের থেকে ব্যতিক্রম। তবে নারীদের মাঝে প্রচারণার সময় ধর্মের ব্যবহারে পিছিয়ে নেই বিএনপিও।

নিজেদের প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য নারীদের কাছ থেকে ‘ওয়াদা’ চাওয়ার দৃশ্যও ধরা পড়ে বিবিসির ক্যামেরায়।

আবার দলটির স্থানীয় পুরুষ সমর্থকদের স্ত্রীদের ভোটও বিএনপি পাবে, এমন বিশ্বাসের কথা জানান তৃণমূল বিএনপির এক নেতা। বলেন, যেহেতু সংসার করছে তাই তার কথার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই স্ত্রীর।

“কারণ আমি তার স্বামী। সে তো বেহেশত-দোযখ চেনে। এই সুবাদে যে যদি আমার নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাহলে সে তো জাহান্নামি হবে, আর আদেশ পালন করলে জান্নাতি হবে”, বলছিলেন নেয়াজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কামাল উদ্দিন বাবুল।

একটি পুকুরের পাড়ে গাছাপালা ঘেরা রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছেন বোরকা পরা কয়েকজন নারী

বিএনপির নারী কর্মীরা ভোটারদের বলছেন প্রতীকের কথা, দিচ্ছেন নানা আশ্বাস

প্রচারণায় বাধা পাওয়ার অভিযোগ জামায়াতের

কেন্দ্র থেকে পাঠানো নির্দেশনা অনুসরণ করে তিনজনের ছোটো টিম করে কর্মীরা ভাগ হয়ে নারী ভোটারদের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানান স্থানীয় মহিলা জামায়াতের শূরা কর্মপরিষদ সদস্য খালেদা নার্গিস।

তবে ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের মধ্যে প্রচার-প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা কোনো সমস্যার মুখোমুখি না হলেও বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানিয়েছেন দলটির নারী কর্মীরা।

গত বৃস্পতিবার জামায়াতের একজন কর্মীর বাড়িতে আয়োজিত নারীদের উঠান বৈঠককে কেন্দ্র করে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তাদের দাবি, বিএনপির অঙ্গসংগঠন যুবদলের একজন কর্মী সেই আয়োজনে বাধা দেন।

“আমাদের ভাইরা বললো ঘরোয়া কিছু করি, মহিলাদের দাওয়াত দেবেন। তারা আমাদের কথা শুনবে। প্রার্থীর সামনে ওরা (বিএনপির লোকজন) চিৎকার করছে। কয় যে কেন এখানে জামায়াতের কর্মীরা আসবে, ভিন্ন পুরুষ কেন আসবে,” বলছিলেন জামায়াতের কর্মী কামরুন্নাহার।

এছাড়াও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার সময়ও নানা ধরনের কটূক্তি ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন দলটির নারী কর্মীরা। যদিও সেসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা।

ওই ঘটনার বিষয়ে জানতে পারার পর জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের সাথে কথা বলে সমাধান করা হয়েছে বলে জানান মি. বাবুল।

গোলাপী রংয়ের শাড়ি মাথায় পেঁচানো ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম যিনি নোয়াখালী পাঁচ আসনের একজন ভোটার

নোয়াখালী পাঁচ আসনের ভোটার ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম

নারী ভোটারদের প্রত্যাশা আর সংশয়

নোয়াখালী পাঁচ আসনে মোট ভোটার আছে পাঁচ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ দুই লাখ ৪২ হাজার ৭২ জন নারী ভোটার।

ফলে অন্য অনেক জায়গার মতো জাতীয় নির্বাচনে ওই আসনেরও জয় নির্ধারণে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নারী ভোটাররা।

আসনটির ভোটার ৭৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম। নির্বাচন নিয়ে শুনছেন নানা আলাপ। প্রচারণায় গিয়ে তার কাছে ভোট চেয়েছে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা। দিয়েছেন নানা আশ্বাসও। কিন্তু তাতে খুব বেশি ভরসা করতে পারছেন না।

“আশ্বস্ত কইরে আংগোরে (আমাদের) রেশন দিবো, ওইটা দিবো, হেইটা দিবো। অন কন লাইগছে (এখন এসব বলছে)। হিয়ান বা দি দেয় না নো দেয় হেইটা হেতারা এ না জানে (পরে দেবে কি না সেটা তারাই জানে)। আমরা কেমনে জানি” বলছিলেন তিনি।

একইসাথে গণভোটে হ্যাঁ-না ভোট দেওয়ার বিষয়টিও তার কাছে পরিষ্কার না।

“হা কেনে দিবো, না কেনে দিবো? কিয়া কয়, হেই কতা বুজি না”।

একই আসনের ভোটার শাহিদা আক্তার লাভলী। এই গৃহিণী চান এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন।

নির্বাচনের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো হবে বলে আশা করছেন লাইলী বেগম, “বাড়িতে থাকা অনেক সমস্যা হয় – চোর ডাকাতের ভয়। এগুলা ভালো করলে হয় আর কি”।

 

বিবিসি নিউজ বাংলা