ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক মহলে ‘সব চুক্তির জননী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় প্রায় দুইশ কোটি মানুষের একটি যৌথ বাজার গড়ে উঠবে এবং বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক চতুর্থাংশ এই চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। স্বাভাবিকভাবেই এ চুক্তি শুধু ভারত ও ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর নজর কেড়েছে।
চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সোমবার ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়াল নিশ্চিত করেন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচকরা একটি উচ্চাভিলাষী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক লাভজনক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। পরদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি ঘোষণা করেন। ঠিক এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে আবারও সমালোচনা করেন, যা থেকে বোঝা যায়—এই চুক্তি ওয়াশিংটনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

কেন এই চুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ
দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের বিরতির পর ২০২২ সালের জুনে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আলোচনাগুলো নতুন করে শুরু হয়েছিল। সেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটিয়ে এই চুক্তি এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করছে, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশকে প্রতিনিধিত্ব করবে এবং প্রায় ১৯০ কোটি ভোক্তার বাজারকে যুক্ত করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই পক্ষের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার।
এই চুক্তি এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ ঝুঁকি কমানোর কৌশল নিচ্ছে। ভারত ও ইউরোপ—উভয়ের জন্যই এটি বিকল্প ও স্থিতিশীল বাণিজ্যপথ তৈরি করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য কী লাভ
ইউরোপীয় কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি পণ্যের ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। এতে প্রতি বছর প্রায় চার বিলিয়ন ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকরা ভারতে সবচেয়ে বড় বাজার সুবিধা পাবেন, যা ভারত আগে কোনো অংশীদারকে দেয়নি। পাশাপাশি আর্থিক পরিষেবা ও সামুদ্রিক পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ইউরোপীয় সেবাদাতারা বিশেষ প্রবেশাধিকার পাবেন। শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় রপ্তানি দ্রুত হবে এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষাও জোরদার করা হবে। ছোট ও মাঝারি ইউরোপীয় ব্যবসার জন্য আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে, যা তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

ভারতীয় ভোক্তাদের জন্য কী সস্তা হবে
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ইউরোপ থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ভারতের সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ শুল্ক ধাপে ধাপে কমে ১০ শতাংশে নামতে পারে। একইভাবে মদের ক্ষেত্রে শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নামবে। বর্তমানে ৫০ শতাংশ শুল্ক থাকা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, যেমন পাস্তা ও চকলেটের ওপর শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর অর্থ, এসব পণ্য ভবিষ্যতে ভারতীয় বাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তা হবে।
ভারতের রপ্তানি খাতে প্রভাব
এই চুক্তি সবচেয়ে বেশি উপকৃত করবে শ্রমনির্ভর খাতগুলোকে, যেমন বস্ত্র, চামড়া, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিকস ও গহনা শিল্প। এসব খাতে ইউরোপীয় উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা কম হওয়ায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা সুবিধা পাবেন। বর্তমানে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শুল্কমুক্ত রপ্তানির কারণে ভারতীয় পণ্যের যে প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধা রয়েছে, এই চুক্তি কার্যকর হলে তা অনেকটাই দূর হবে।

ট্রাম্প শুল্কনীতির পাল্টা কৌশল
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের জনগণের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে এবং এটি বিশ্বের দুই বড় অর্থনীতির অংশীদারিত্বের একটি শক্ত উদাহরণ। তাঁর মতে, এই চুক্তি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি যৌথ অঙ্গীকারকেও শক্তিশালী করবে। তিনি এটিকে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য জোটের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য চুক্তির পরিপূরক হিসেবেও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভারত-ইইউ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ককেন্দ্রিক নীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসন আগের বছর ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পাশাপাশি রাশিয়ার তেল কেনার কারণে অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।

ইউরোপীয় নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আজ সত্যিই ইতিহাস রচিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দুইশ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। তিনি এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূচনা হিসেবেও দেখছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















