প্রাণঘাতী এক ভয়াবহ তুষার ঝড়ের পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এখনো বরফ পরিষ্কার ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াইয়ে ব্যস্ত। নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঝড়ে কোথাও এক ফুটের বেশি তুষার জমেছে, কোথাও পুরু বরফের আস্তরণে অচল হয়ে পড়েছে সড়ক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও বিমান চলাচল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েক হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
পূর্বাঞ্চল থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত জমে থাকা বরফ ও বরফে মোড়া সড়ক জনজীবন স্থবির করে দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস, টেক্সাস ও নর্থ ক্যারোলাইনা—সবখানেই তীব্র শীত আর তুষারের দাপটে স্বাভাবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত ২৫টি অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে কয়েক দশকের মধ্যে এমন শীত দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও এক ইঞ্চির মতো পুরু বরফে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি হয়েছে। টেনেসি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য গুলোর একটি। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রায় আট লাখ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন অবস্থায় তীব্র শীত মোকাবিলা করছে।
ঝড়ে মৃত্যুর ঘটনাও হৃদয়বিদারক। টেক্সাসের ফ্রিসকোতে স্লেজিং দুর্ঘটনায় এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। আর্কানসাসে বরফের ওপর যানবাহনে টান দেওয়ার সময় গাছে ধাক্কা লেগে প্রাণ হারিয়েছে আরেক তরুণ। পেনসিলভানিয়ায় তুষার সরাতে গিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অস্টিনে পরিত্যক্ত একটি পেট্রোল পাম্পে আশ্রয় নিতে গিয়ে ঠান্ডায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটিতে শীতের প্রভাবে অন্তত পাঁচ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছেন মেয়র জোহরান মামদানি।
তুষারঝড় ধীরে ধীরে পূর্ব উপকূল ছেড়ে আটলান্টিকের দিকে সরে গেলেও বিপদ এখনও কাটেনি। কানাডা থেকে আসা আর্কটিক শীতল বাতাস আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রাকে হিমাঙ্কের অনেক নিচে আটকে রাখবে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া বিভাগ। প্রায় ২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রার চরম শীত সতর্কতার আওতায় রয়েছে। টেক্সাসের লাবক শহরে তাপমাত্রা নেমেছে মাইনাস বিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, আর নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ও বোস্টনে পুরো সপ্তাহজুড়েই এক অঙ্কের তাপমাত্রা বিরাজ করার আশঙ্কা রয়েছে।
এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিমান চলাচল। একদিনেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বারো হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা মহামারির পর সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের একটি। সোমবার হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।
বরফ ও জমাট বরফে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা সড়কে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। কোথাও পুরোনো দমকল গাড়ি নিয়ে মানুষকে উষ্ণ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, কোথাও প্রতিবেশীরা একে অন্যকে খাবার ও গরম পোশাক দিয়ে সহায়তা করছেন। নিউ মেক্সিকোর বোনিটো লেকে ৩১ ইঞ্চি তুষার জমার পর বাসিন্দারা দিনভর বরফ পরিষ্কারে ব্যস্ত। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে তুষারের উচ্চতা ছুঁয়েছে প্রায় এক ফুট।
নিউ ইয়র্কে জাতীয় রক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে। তীব্র শীতের কারণে স্কুল বন্ধ রেখে অনলাইন ক্লাসের ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র মামদানি। তিনি মজার ছলে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে তাঁকে দেখলে বরফের বল ছুড়তে পারে। তবে সব দুর্ভোগের মাঝেও কোথাও কোথাও মানুষ তুষারের আনন্দও উপভোগ করেছে, পার্কে জমেছে স্বতঃস্ফূর্ত বরফ যুদ্ধ আর শিশুদের স্লেজিংয়ের উচ্ছ্বাস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















