আলাস্কার প্রত্যন্ত শহর নোমে ডিপথেরিয়ার ভয়াবহ মহামারির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের শেষ পাতা বন্ধ হয়ে গেল। ১৯২৫ সালের সেই মহামারির শেষ পরিচিত জীবিত ব্যক্তি জির্ডেস উইন্টার ব্যাক্সটার আর নেই। আলাস্কার রাজধানী জুনো শহরের একটি হাসপাতালে পাঁচ জানুয়ারি তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল একশ এক বছর।
ডিপথেরিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ের শুরু
জির্ডেস উইন্টার ব্যাক্সটার জন্মেছিলেন ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, নরওয়ে থেকে আসা অভিবাসী পরিবারে। বয়স তখন মাত্র এগারো মাস, যখন ১৯২৫ সালের জানুয়ারিতে নোম শহরে ভয়াবহ ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে। শ্বাসনালি বন্ধ করে দেওয়া এই সংক্রামক রোগে তখন একের পর এক শিশু মারা যেতে থাকে। জির্ডেসকে জানুয়ারির শেষে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় উচ্চ জ্বর ও ডিপথেরিয়ার উপসর্গ নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যে তাঁর মা রাগনহিল্ড ও ভাই জনও আক্রান্ত হন।

বরফের দেশে চিকিৎসার লড়াই
সেই সময় নোম শহরে মাত্র একজন চিকিৎসক ছিলেন। প্রয়োজনীয় অ্যান্টিটক্সিন ছিল প্রায় এক হাজার মাইল দূরের অ্যাঙ্কোরেজে। তীব্র শীত, বরফে জমে থাকা সমুদ্রবন্দর আর উড়োজাহাজ চলাচলের অযোগ্য আবহাওয়ার কারণে এক অভিনব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ট্রেনে করে ও পরে কুকুরের স্লেজে প্রায় সাতশ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। এই অভিযানে অংশ নেন বিশ জন স্লেজচালক ও প্রায় দেড় শত কুকুর। ইতিহাসে এটি পরিচিত হয়ে ওঠে দয়ার মহাযাত্রা নামে।
পাঁচ দিন সাত ঘণ্টার সেই দৌড়
নেনানা থেকে শুরু হওয়া এই রিলে যাত্রা ভয়াবহ ঝড়, তুষারঝড় আর মরণশীতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। পথে পথে স্লেজচালকেরা দায়িত্ব বদল করেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে অবশেষে নোমে পৌঁছে যায় অ্যান্টিটক্সিন। তার আগেই জির্ডেসকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের পরীক্ষামূলক ডোজ দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিরাম পৌঁছানোর পর তাঁর মা ও ভাই তা গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারটির তিনজনই বেঁচে যান এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসে।

নীরব জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়
এই ঐতিহাসিক ঘটনার সময় এতটাই ছোট ছিলেন জির্ডেস যে তিনি নিজে তেমন কিছু মনে রাখতে পারেননি। সারা জীবন এ বিষয়ে খুব বেশি কথা বলতেন না। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবেই দেখতেন। তবে কুকুরের স্লেজ অভিযানের ইতিহাসে একটি বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট মত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত নায়ক ছিল টোগো নামের কুকুরটি, যে সবচেয়ে দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়েছিল, অথচ বহু বছর ধরে সব আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাল্টো।

নোম থেকে জুনো, জীবনের পথচলা
মহামারির পর দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে পরিবারটি নোম ছাড়ে। পরে তাঁরা সিয়াটল হয়ে জুনোতে স্থায়ী হন। জির্ডেস পরে আলাস্কার সরকারি দপ্তরে কাজ করেন। তাঁর স্বামী ছিলেন স্থানীয় পৌর পরিষদের সদস্য, আর নীরবে রাজনৈতিক পরামর্শ দিয়ে তিনিও হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ।
জনস্বাস্থ্যের প্রতীক হয়ে থাকা
জির্ডেস উইন্টার ব্যাক্সটারের জীবন আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব, টিকাদান ও সচেতনতার এক জীবন্ত উদাহরণ। ডিপথেরিয়ার সেই সিরামই হয়তো তাঁকে দীর্ঘ ও প্রায় রোগমুক্ত জীবন দিয়েছে, এমনটাই বিশ্বাস পরিবারের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















