গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান বদল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে বিশাল ভূখণ্ড দখলের দাবি, অন্যদিকে হঠাৎ সরে আসা—এই দোলাচল শুধু মিত্রদের অস্বস্তিতেই ফেলেনি, ন্যাটোর ভিতও নড়বড়ে করে দিয়েছে।
উত্তর গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস এখন দ্বীপটির শেষ যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি। একসময় যেখানে ডজনের বেশি মার্কিন ঘাঁটি ছিল, এখন সেখানে পড়ে আছে জংধরা স্মৃতি। তবু এই বরফাচ্ছাদিত ভূখণ্ডই হয়ে ওঠে ট্রাম্পের শক্তি প্রদর্শনের নতুন মঞ্চ।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সর্বোচ্চ দাবি
ট্রাম্পের কূটনৈতিক কৌশল বরাবরই বড় দাবি দিয়ে শুরু হয়। গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি প্রকাশ্যে দাবি তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ডেনমার্ককে গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দিতে হবে। আফগানিস্তান সহ বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকা এক ইউরোপীয় মিত্রের কাছে এমন দাবি আটলান্টিক জোটের সীমা পরীক্ষা করে।
ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প ডেনমার্ককে উদ্দেশ করে বলেন, তারা যদি রাজি হয় তবে কৃতজ্ঞতা পাবে, আর না হলে যুক্তরাষ্ট্র তা মনে রাখবে। এই বক্তব্যে চাপ আর হুমকির সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চাপের সীমা আর পিছু হটা
কিন্তু দ্রুতই ট্রাম্প বুঝতে পারেন, এই চাপেরও সীমা আছে। নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিতে বাজারে ধস নামে, মিত্র দেশগুলো প্রকাশ্যে আপত্তি তোলে। ওয়াশিংটনে ফেরার আগেই পরিষ্কার হয়ে যায়, পশ্চিমা জোটে ক্ষতি হয়ে গেছে।
পরে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প জানান, ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে পূর্ণ মালিকানার কথা নেই। বরং গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি বিস্তারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ইঙ্গিত দেন তিনি। এমন ব্যবস্থাকে তিনি আগের চুক্তির চেয়েও উদার বলে বর্ণনা করেন।
তবু সন্দেহ থেকেই যায়, মালিকানার দাবি কি সত্যিই শেষ, নাকি সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
মিত্রদের আস্থায় চিড়
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে পিছু হটলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র নিজেই গড়েছিল, সেখানে গভীর ফাটল ধরেছে। ইউরোপীয় নেতারা এখন ভাবছেন, পরের চাপটা কোথায় পড়বে।
চীন ও রাশিয়ার মতো বড় হুমকির মাঝেও গ্রিনল্যান্ড কীভাবে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে জরুরি নিরাপত্তা ইস্যু হয়ে উঠল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়ার মূল্য অনেক, অথচ গ্রিনল্যান্ড দখলের বাস্তব লাভ সামান্য।

নিয়ম ভিত্তিক ব্যবস্থার অবক্ষয়
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ডাভোসে সরাসরি বলেন, শক্তিশালী দেশ যা চায় তা করে, দুর্বলদের সহ্য করতে হয়। তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিয়ম ভিত্তিক ব্যবস্থার ক্ষয়কেই সামনে আনে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামনে পথ সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বাস্য ঘোষণা করা এক কথা, কিন্তু তার বিকল্প তৈরি করা আরেক কথা। ইউরোপের দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতা আর পারমাণবিক শক্তির কোনো বাস্তব বিকল্প নেই।
ন্যাটোতে টানাপোড়েন
ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটোর অস্তিত্ব অর্থহীন। ইউরোপের যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এতে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বাধ্য হন পাল্টা জবাব দিতে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্য ন্যাটো দেশের সৈন্যদের প্রাণহানির কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
রুটের কূটনীতিতে সাময়িকভাবে গ্রিনল্যান্ড সংকট প্রশমিত হয়। তবু ইউরোপীয় নেতাদের মনে শঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ গ্রিনল্যান্ডের পর ট্রাম্পের পরবর্তী দাবি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু দেখিয়ে দিল, শক্তির রাজনীতি শুধু লক্ষ্যভূমিতেই নয়, দীর্ঘদিনের জোট আর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও গভীর ছাপ ফেলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















