মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটাতে চলেছে কাঠ দিয়ে তৈরি উপগ্রহ। ধাতব কাঠামোর বিকল্প হিসেবে কাঠ ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আশাবাদী। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে উৎক্ষেপিত প্রথম কাঠের উপগ্রহ পরীক্ষায় সব লক্ষ্য পূরণ না হলেও ফলাফল দেখিয়েছে, মহাকাশের কঠিন পরিবেশেও কাঠ টিকে থাকতে পারে।
কাঠের উপগ্রহের প্রথম পরীক্ষা
দুই হাজার চব্বিশ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় লিগনোস্যাট নামের একটি ক্ষুদ্র উপগ্রহ। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলেও এটিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ উপগ্রহটির বড় অংশ তৈরি হয়েছিল ম্যাগনোলিয়া কাঠ দিয়ে, যা শক্ত, সহজে গড়া যায় এবং আগের পরীক্ষায় মহাকাশ পরিবেশে সহনশীল প্রমাণিত হয়েছিল।
মাইনাস একশ থেকে প্লাস একশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ওঠানামা, সূর্য বায়ুর বিকিরণ—সবকিছুর মধ্যেও উপগ্রহটির কাঠের প্যানেল অক্ষত ছিল। উৎক্ষেপণের একশ ষোলো দিন পর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় পর্যন্ত কাঠের গঠন স্থিতিশীল ছিল বলে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে।

বার্চ কাঠের পথে ফিনল্যান্ড
ফিনল্যান্ডের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ম্যাগনোলিয়ার বদলে বার্চ কাঠের পাতলা স্তর ব্যবহার করে আরেকটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ তৈরি করেছে। এই কাঠ সাধারণত তরল গ্যাস সংরক্ষণের ট্যাংক ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয় এবং অত্যন্ত কম তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এ বছরের মধ্যেই এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ধাতুর চেয়ে কাঠের সুবিধা
উপগ্রহ তৈরিতে কাঠ ব্যবহারের একটি বড় সুবিধা হলো বায়ুমণ্ডলে ধাতব কণার পরিমাণ কমানো। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মহাকাশ বর্জ্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে এবং এর সঙ্গে ধাতব কণাও জমা হচ্ছে। এই ধাতু ভবিষ্যতে ওজোন স্তরের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কাঠ ব্যবহার করলে পুনঃপ্রবেশের সময় উপগ্রহ সহজে পুড়ে যায়, ফলে বড় ধাতব অংশ ভূপৃষ্ঠে পড়ার ঝুঁকি কমে। এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া নিয়ম মেনে চলাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, কাঠ যুক্ত করলে এক টন পর্যন্ত ওজনের উপগ্রহ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই নিরাপদে বায়ুমণ্ডলে ঢুকতে পারবে।

যোগাযোগ ও ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
কাঠের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি রেডিও সংকেতে বাধা সৃষ্টি করে না। ফলে যোগাযোগ যন্ত্রপাতিকে আলাদা করে বাইরে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। এতে মহাকাশের ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষের আঘাত থেকে যন্ত্রাংশ সুরক্ষিত থাকে এবং নিম্ন কক্ষপথে ঘর্ষণও কম হয়। এতে উপগ্রহের কার্যকাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
এ ছাড়া কাঠ ধাতুর তুলনায় সস্তা, কম্পন শোষণ করে এবং তাপ নিরোধক হিসেবেও ভালো কাজ করে। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় এবং সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা বাড়ে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তবে কাঠ ব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। মহাকাশের শূন্যতায় কাঠের ভেতরের আর্দ্রতা ও জৈব উপাদান বের হয়ে যেতে পারে, যা কাঠকে দুর্বল করতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ক্ষতি খুব বড় নয়। বিশেষ আবরণ ব্যবহার করে ঝুঁকি আরও কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে ছোট মহাকাশযানগুলো আবার সমুদ্রযানের উল্টো পথে হাঁটতে পারে—মানবসৃষ্ট ধাতু ছেড়ে ফিরে যেতে পারে প্রাকৃতিক কাঠের দিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















