টয়োটা গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার পরিকল্পনা শুরুতে খুবই সাধারণ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজ কে অধিগ্রহণের সেই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে এক তীব্র করপোরেট সংঘাতে। একদিকে রয়েছে উচ্চমূল্যের দাবিতে সোচ্চার সক্রিয় বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে জাপানের সেই করপোরেট সংস্কৃতি যেখানে শেয়ারহোল্ডারদের লাভের চেয়ে অংশীজনের ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দর বাড়িয়ে ও থামেনি বিরোধিতা
চলতি মাসে টয়োটা তাদের প্রস্তাবিত মূল্য প্রায় পনের শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় সাতাশ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণে উন্নীত করে। প্রতি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয় আঠারো হাজার আটশ ইয়েন। তবু এতে অসন্তোষ কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সক্রিয় বিনিয়োগ তহবিল এলিয়ট জানিয়েছে, এই মূল্য টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজের প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় প্রায় চল্লিশ শতাংশ কম। তাদের দাবি, স্বাধীনভাবে পরিচালিত হলে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য আরও বেশি হতে পারে।
এলিয়ট বনাম টয়োটা নেতৃত্ব
টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজের প্রায় সাত শতাংশ শেয়ারধারী এলিয়ট অভিযোগ তুলেছে, পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয় এবং কর্পোরেট সুশাসনের মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করছে না। জুনে প্রথম প্রস্তাব ঘোষণার পর থেকেই তারা বেশি দামের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এই দ্বন্দ্বে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন টয়োটার চেয়ারম্যান আকিও টয়োদা। প্রতিষ্ঠাতার নাতি আকিও টয়োদা নিজেও এই চুক্তিতে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত, কারণ তিনি নিজের শেয়ারের অংশ বাড়াতে বিনিয়োগ করছেন।
চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা
এই বিরোধিতা টয়োটার পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এলিয়ট বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়েছে প্রস্তাবিত দামে শেয়ার না দিতে। তাদের যুক্তি, টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজ আলাদা থাকলে বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারবে। এতে টয়োটাকে হয় আরও বেশি দাম দিতে হবে, নতুবা পুরো চুক্তিই বাতিল হয়ে যেতে পারে।
জাপানি করপোরেট দর্শনের পরীক্ষা
এই ঘটনাকে জাপানে চুক্তি সম্পাদনের ভবিষ্যৎ পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানি ব্যবসায়িক দর্শনের একটি মূল ধারণা হলো সবার মঙ্গল, যেখানে কর্মী, গ্রাহক, সমাজ ও শেয়ারহোল্ডার সবাই লাভবান হবে। কিন্তু বিদেশি সক্রিয় বিনিয়োগকারীদের চাপ সেই দর্শন কতটা টিকে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে অভিযোগ
চুক্তি ঘোষণার পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আর্থিক তথ্য প্রকাশ ও সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে অভিযোগ করেন। বাজারে শেয়ারের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, যা ইঙ্গিত দেয় বিনিয়োগকারীরা আরও উচ্চমূল্যের প্রত্যাশা করছেন।
বাজার পরিস্থিতি ও মূল্যায়ন বিতর্ক
বাজার চাঙা থাকায় টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন ক্রস শেয়ারধারীদের মূল্য ও বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, এতে প্রস্তাবিত দাম আরও কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারাও মূল্য বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
সুশাসন সংস্কার বনাম স্বল্প মেয়াদী মুনাফা
টয়োটা পক্ষের দাবি, এই অধিগ্রহণের মাধ্যমে সুশাসন কাঠামো সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের মতে, আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং ভোট কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, অতিরিক্ত শেয়ারহোল্ডার চাপ জাপানের শিল্পখাতকে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত। এলিয়ট ভবিষ্যতে শেয়ারের অংশ আরও বাড়াতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। টয়োটা গ্রুপের ভেতরেও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজ অধিগ্রহণ শুধু একটি ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, বরং জাপানের করপোরেট সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















