দুবাই থেকে—“মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার মুহূর্ত থেকেই ভয় শুরু হয়।” জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী রানি মুখার্জি কথাটা ঘুরিয়ে বলেন না। দশ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানের মা হিসেবে এই ভয় যে কতটা বাস্তব, তা তিনি লুকোতে চান না।
মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ
একজন মা হিসেবে নিরাপত্তার অনুভূতি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা বলতে গিয়ে রানি বলেন, সন্তান জন্মানোর পর থেকেই মায়েদের হৃদয় যেন শরীরের বাইরে ঘুরে বেড়ায়। ছেলে হোক বা মেয়ে—সব সন্তানের ক্ষেত্রেই একটাই প্রার্থনা, তারা যেন সবসময় নিরাপদ থাকে। পৃথিবীতে বেরিয়ে তাদের ভুল করতে হবে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে, কিন্তু সেই দুশ্চিন্তা কখনো পুরোপুরি চলে যায় না।
এই উদ্বেগই মারদানি সিরিজের আবেগী চালিকাশক্তি। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই ফ্র্যাঞ্চাইজি ২০১২ সালের নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর জন্ম নেওয়া ক্ষোভেরই এক শিল্পরূপ। সময় পেরোলেও সেই ক্ষোভ ম্লান হয়নি।
নির্ভয়ার ক্ষোভ থেকে মারদানির জন্ম
নির্ভয়া ঘটনার পর দেশজুড়ে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ তৈরি হয়েছিল, তা ভারতের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সম্মিলিত রাগই আজও শিবানী শিবাজি রায় চরিত্রে রানি মুখার্জির অভিনয়ে প্রাণ জোগায়। তাঁর কথায়, ২০২৬ সালেও আমরা একই বিষয় নিয়ে কথা বলছি, যা প্রমাণ করে সমস্যার গভীরতা এখনো কাটেনি।
মারদানি ৩-এ নতুন মোড়
মারদানি ৩-এ দর্শকদের জন্য রয়েছে অপ্রত্যাশিত এক মোড়। এই ছবিতে প্রতিপক্ষ একজন নারী, যে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মাদক খাইয়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত। রানি স্পষ্টভাবে বলেন, অপরাধের কোনো লিঙ্গ নেই। অশুভ যে কারও হৃদয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নারী বা পুরুষ হওয়ার নয়, প্রশ্নটা হলো কে অপরাধী।
শ্রেণি, দারিদ্র্য এবং অপরাধ
ছবিতে নিখোঁজ মেয়েরা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণি থেকে আসে। সমাজ কি শ্রেণিভেদে নারীর প্রতি অপরাধকে আলাদা চোখে দেখে—এই প্রশ্নে রানি ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে বলেন, উত্তর পেতে হলে দর্শকদের ছবিটি দেখতে হবে।
ক্ষোভ কতদিন থাকে
খবরের জগতে ক্ষোভ খুব দ্রুতই অন্য শিরোনামে চাপা পড়ে যায়। এই বাস্তবতার কথা উঠতেই রানি জোর দিয়ে বলেন, এমন গল্প কখনো বেশি হয়ে যায় না। বরং মারদানি এই আলোচনা শুরু করেছিল বলেই আজ আরও বেশি নারী পুলিশকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি হচ্ছে। যত বেশি গল্প বলা হবে, তত বেশি আলোচনা চলবে, আর এই আলোচনাই জরুরি।

আশা এবং ন্যায়বিচারের অনুভূতি
রানির কাছে এই পুনরাবৃত্তি ক্লান্তিকর নয়, বরং চাপ তৈরি করার একটি উপায়। তাঁর বিশ্বাস, একই বিষয় নিয়ে আরও ছবি ও গল্প তৈরি হলে বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে এবং অপরাধ করতে চাওয়া মানুষের মনে ভয় তৈরি হবে। মারদানি সিরিজের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো নৈতিক তৃপ্তি—এই বিশ্বাস যে শেষ পর্যন্ত ভালোই জিতবে। দর্শককে তিনি এই আশাটাই দিতে চান।
শক্তি, নারীত্ব এবং ইউনিফর্ম
শিবানী শিবাজি রায় চরিত্রে রানি কখনো ক্লান্ত বা ভেঙে পড়া মনে হয় না। তিনি পরিপাটি, সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, ইউনিফর্ম পরা একজন নারীকে পর্দায় তুলে ধরা বিশাল দায়িত্ব। শক্তি কখনো পুরুষালি বা নারীর সঙ্গে যুক্ত নয়, শক্তি হলো মনোভাব এবং চরিত্রের বিষয়। তিনি ছোটবেলা থেকেই শক্ত নারীদের দেখে বড় হয়েছেন, তাই শক্ত হওয়াকে তিনি নারীর স্বাভাবিক গুণ হিসেবেই দেখেন।
সিনেমা, সাফল্য এবং লেবেল
সাম্প্রতিক বক্স অফিস সাফল্য নির্মাতাদের আরও সাহসী গল্প বলতে অনুপ্রাণিত করছে বলে মনে করেন রানি। তাঁর কাছে মারদানি ৩-এর সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটিই তাঁকে পরের ছবির জন্য শক্তি দেবে। তবে তিনি চান না এই ছবিকে নারীপ্রধান বা পুরুষপ্রধান বলে চিহ্নিত করা হোক। তাঁর মতে, লেবেল লাগালেই ছবির উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। এটি কোনো পুরুষবিদ্বেষী ছবি নয়, এটি ভালো বনাম অশুভের গল্প, যেখানে ভালোই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
দুবাইয়ের স্মৃতি এবং শেষ আহ্বান
আলোচনার শেষদিকে কথাবার্তা ঘুরে যায় দুবাই, খাবার আর স্মৃতিতে। রানি বলেন, তিনি ও তাঁর মেয়ে দুজনেই দুবাই ভালোবাসেন এবং বছরে কয়েকবার এখানে আসেন। খাবারের বৈচিত্র্য তাঁদের বিশেষভাবে টানে।
বিদায় নেওয়ার আগে রানি একটাই কথা জোর দিয়ে বলেন—শুধু নিজে ছবিটি দেখলেই হবে না, সঙ্গে আরও অনেক মানুষকে নিয়ে হলে যেতে হবে।
মারদানি ৩ সংযুক্ত আরব আমিরাতে মুক্তি পাচ্ছে ৩০ জানুয়ারি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















