আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম প্রায় ৩০ টাকা বেশি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। বিপিসির প্রস্তাব অনুযায়ী লিটারপ্রতি দাম ৮১ টাকা ধরা হয়েছে। তবে প্রধান ক্রেতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে এই দাম ৫০ টাকা ৮২ পয়সার বেশি হওয়া উচিত নয়।
বিইআরসির গণশুনানিতে দাম বিতর্ক
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিপিসি, পিডিবি, বিইআরসি কারিগরি কমিটি, তেল বিপণন কোম্পানি ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়।
বিপিসির যুক্তি
গণশুনানিতে বিপিসির জেনারেল ম্যানেজার এটিএম সেলিম বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৪৭৮ দশমিক ৪৫ ডলার। পরে ডিসেম্বর মাসে তা কমে ৩৪০ দশমিক ৯৪ ডলারে আসে। শুরুতে লিটারপ্রতি ৮৫ টাকা প্রস্তাব করা হলেও শুল্ক ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে লিটারপ্রতি ৮১ টাকা দাম নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পিডিবির আপত্তি ও লোকসানের অভিযোগ
বিপিসির তথ্যের বিরোধিতা করে পিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, বিপিসির কাছ থেকে তেল কিনে পিডিবি বড় অঙ্কের লোকসানে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির কাছে তেল বিক্রি করে বিপিসি ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যেখানে ৫৭ টাকায় তেল আমদানি করছে, সেখানে বিপিসি পিডিবির কাছ থেকে নিচ্ছে প্রায় ৮৬ টাকা। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইউনিট খরচ বেড়ে ১৮ দশমিক ৪১ টাকায় দাঁড়াচ্ছে, যা পাইকারি বিদ্যুৎমূল্যের তুলনায় অনেক বেশি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের চাপ
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ফার্নেস অয়েলের উচ্চ দামের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে। সময় অনুযায়ী দাম সমন্বয় করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা উদ্দেশ্য নয়, তবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লাভ করতে গিয়ে আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতির মুখে ফেলা ঠিক নয়।
বিইআরসি কারিগরি কমিটির সুপারিশ
বিইআরসির কারিগরি কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বর্তমান ৮৬ টাকা থেকে ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়ে লিটারপ্রতি ৭৪ টাকা ৪ পয়সা করার সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যাতে সব পক্ষের জন্য ভারসাম্য থাকে।
তেল বিপণন কোম্পানির মুনাফা প্রসঙ্গ
শুনানিতে বিপিসির অধীনস্থ পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ বাড়ানোর দাবি তোলে। তবে প্রশ্নের মুখে তারা স্বীকার করে, প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে লাভ করছে। গত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা অয়েল কোম্পানি কর্মীদের ১৫ লাখ টাকা এবং মেঘনা অয়েল ৬ লাখ টাকা করে প্রফিট বোনাস দিয়েছে বলেও জানানো হয়। এ অবস্থায় মার্জিন বাড়ানোর দাবিতে ভোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভোক্তাদের দাবি ও আইনি বিষয়
ভোক্তা প্রতিনিধিরা ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বিপিসি নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁদের বক্তব্য, আইন অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানির দাম নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার বিইআরসির।
পরবর্তী পদক্ষেপ
বিইআরসি চেয়ারম্যান জানান, এ বিষয়ে লিখিত মতামত থাকলে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জমা দেওয়া যাবে। এরপর কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















