মিনিয়াপোলিসের আদিবাসী পাড়ায় আবারও রাস্তায় নেমেছে প্রতিরোধ। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় নিজেদের মানুষকে রক্ষা করতে নজরদারি শুরু করেছে আদিবাসী সংগঠনগুলো। প্রায় ছয় দশক আগে যে আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল এই শহরেই, সেই আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্টের উত্তরাধিকার আজ নতুন বাস্তবতায় নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
উত্তরাধিকার থেকে দায়িত্বের পথে
ক্রো বেলকোর্টের শৈশব কেটেছে আদিবাসী সংস্কৃতির ভেতরেই। তার বাবা ক্লাইভ বেলকোর্ট তাকে ছোটবেলা থেকেই আদিবাসী পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে শিখিয়েছিলেন। পাওওয়াও নৃত্য, ঘামঘর আচার আর সাংস্কৃতিক শিক্ষার মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠা। ক্লাইড বেলকোর্ট ছিলেন আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। আজ সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন তার ছেলে ক্রো বেলকোর্ট, যিনি মিনিয়াপোলিসের ইন্ডিজেনাস প্রটেক্টর মুভমেন্ট এর নির্বাহী পরিচালক।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, নিজেদের কিছু করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। শহরে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়তে থাকায় আদিবাসী মানুষদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভয় থেকেই শুরু হয় কমিউনিটি প্যাট্রোল।

গুলিবিদ্ধ মৃত্যুর পর উত্তেজনা
গত ২৪ জানুয়ারি শহরের এক বিক্ষোভে এক নার্স গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে এই উত্তেজনার শুরু আরও আগে। চলতি মাসের শুরুতে আরেকটি গুলিবিদ্ধ মৃত্যুর পর থেকেই মিনিয়াপোলিস ও আশপাশের এলাকায় আদিবাসী নেতারা দিনরাত পাহারার ব্যবস্থা করেন।
ক্রো বেল কোর্ট জানান, শহরের দক্ষিণাংশে যেখানে আদিবাসী জনসংখ্যা বেশি, সেখানেই মূলত নজরদারি চলছে। প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য থেকেও অনেকে এসে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই, নিজের মানুষকে নিরাপদ রাখা।
জাতিগত প্রোফাইলিংয়ের অভিযোগ
জানুয়ারির শুরুতে মিনিয়াপোলিস এলাকায় পাঁচজন আদিবাসী পুরুষকে আটক করার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। আদিবাসী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কেবল চেহারা আর পরিচয়ের কারণে তাদেরকে অবৈধ অভিবাসী ধরে নেওয়া হয়েছে। ক্রো বেলকোর্ট বলেন, মাঠে নামা কর্মকর্তারা অনেক সময়ই আদিবাসী আর অন্য অভিবাসীদের পার্থক্য বুঝতে পারেন না।
এই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয় ফোর্ট স্নেলিংয়ে, যা ইতিহাসে আদিবাসীদের জন্য এক ভয়াবহ স্মৃতির স্থান। ইতিহাসবিদদের মতে, সেখানে একসময় শত শত আদিবাসী নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে আটকে রাখা হয়েছিল।
ভয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা
এই ভয় কেবল গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সংগঠনের এক নেত্রী নিজের গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় কর্মকর্তাদের হুমকির মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। জানালায় হাত দিয়ে জানালা নামাতে বাধ্য করার চেষ্টা, ভাঙার হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা অনিরাপদ, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এই অভিজ্ঞতার পর সংগঠনগুলো বার্তা দিয়েছে, কেউ যেন একা বাইরে না যায়। একসঙ্গে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
দৈনন্দিন জীবনেও আতঙ্ক
মিনিয়াপোলিসের আমেরিকান ইন্ডিয়ান সেন্টারের পরিচালক জানান, প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে ভয়ের। শিশু-কিশোর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, দিনের আলোতেই সীমিত করা হয়েছে সব কর্মসূচি। বয়স্কদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তারা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন।
একজন আদিবাসী নারী বলেন, কখনো ভাবিনি গলায় ঝুলিয়ে নিজের গোত্রের পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরতে হবে, শুধু এই আশঙ্কায় যে কখন আমাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
![]()
পরিচয়পত্রই এখন ঢাল
এই বাস্তবতায় আদিবাসী সংগঠনগুলো মানুষকে সব সময় গোত্রের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। অনেকেই রিজার্ভেশনে যেতে না পারায় শহরেই পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে এসে প্রতিনিধিরা এক দিনে বহু পরিচয়পত্র বিতরণ করে গেছেন।
মিনিয়াপোলিস ও আন্দোলনের ইতিহাস
মিনিয়াপোলিস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় আদিবাসী নগরকেন্দ্র। গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি নীতির কারণে বহু আদিবাসী রিজার্ভেশন ছেড়ে শহরে আসতে বাধ্য হন। কাজের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তারা পড়ে যান বঞ্চনা ও বৈষম্যের মধ্যে।
এই ক্ষোভ থেকেই ষাটের দশকে জন্ম নেয় আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট। মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি ভূমি ফেরত আন্দোলনের সূচনা হয় এখান থেকেই। আলকেট্রাজ দখল, সরকারি দপ্তর ঘেরাও, আহত নি আন্দোলন—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল এই সংগঠন।
ফের রাস্তায় নামা
ক্রো বেলকোর্ট বলেন, তার বাবার সময়ে আদিবাসী এলাকাগুলো ছিল অবহেলিত আর সহিংসতায় ভরা। তখন পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাহারা দিত আন্দোলনের কর্মীরা। দুই হাজার কুড়িতে শহরের আরেক সহিংস সময়ে আবার সেই পাহারা ফিরে আসে। সেই অভিজ্ঞতাই আজ নতুন করে মানুষকে এক করেছে।
তিনি বলেন, বাবার আর মায়ের দেখানো পথেই তিনি হাঁটছেন। পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু তারা হাল ছাড়বেন না। নিজেদের লাইনে দাঁড়ানোর বদলে নিজেদের মতো করেই লড়াই চালিয়ে যাবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















