০৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের বাধা পেরিয়ে ফিরছে ট্রাম্পের শুল্ক, চাপে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তা সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি: ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে মার্কিন ভোটারদের, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কার আশঙ্কা পারমাণবিক ভারসাম্যের নতুন যুগ সিন্ধু পুলিশের ‘এনকাউন্টার’ কৌশল নিয়ে বিতর্ক: বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? তাইওয়ান ঘিরে চীনের ‘ছায়া নৌবাহিনী’, একসঙ্গে হাজার মাছধরা নৌকার মহড়া জাকার্তায় পুলিশ-সেনা সংঘাত, সোনার বার ও কোটি টাকার নগদ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা ঢাকায় গ্যাস লিকেজ বিস্ফোরণ: দেড় মাসের সংসারেই ঝরে গেল নবদম্পতি ও শিশুর প্রাণ বাংলাদেশে আরও ৪ সন্দেহভাজন হাম মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮২০

ম্যাংগ্রোভের পথে যাত্রা: প্রকৃতি ও অনুপ্রেরণার চার দিনের অভিজ্ঞতা

  • ইউএনবি
  • ০৬:১৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • 61

বরিশালের ব্যস্ত সড়ক ছেড়ে সুন্দরবনের শান্ত, পান্না-সবুজ জলরাশির দিকে যাত্রা সহজ নয়—বিশেষ করে যদি সেই পথ পাড়ি দিতে হয় সাইকেলে। তবু টেকসই উন্নয়নে নিবেদিত তিনজন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞের কাছে ২৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাইকেল যাত্রা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে কাছ থেকে দেখার এক আদর্শ প্রস্তুতি।

এই ভ্রমণ কেবল দর্শনীয় স্থান দেখা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল প্রকৃতি-সম্মত নির্মাণ ধারণা নিয়ে এক যৌথ চিন্তার মিলনমেলা।

এই দলে ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের তিনজন বিশেষজ্ঞ। নেদারল্যান্ডসের জীববিজ্ঞানী ও পাখিপ্রেমী উলফ বিয়েরেন্স, নেদারল্যান্ডসের পরিবেশবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলস ভ্যান ডেন বার্গে এবং বাঁশের আবাসন নিয়ে কাজ করা ফরাসি স্থপতি রাফায়েল আসকোলি।

ভিন্ন পেশাগত পটভূমি হলেও তাঁদের লক্ষ্য এক—মা প্রকৃতিকে মাথায় রেখে নির্মাণ। উলফ ও নিলস নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘ইজি হাউজিং’-এ, যা উগান্ডা ও কেনিয়ায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও কার্বন-নিরপেক্ষ ঘর নির্মাণে কাজ করছে। অন্যদিকে রাফায়েল নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘হাউজিং নাউ’-এ, যা মিয়ানমারে টেকসই বাঁশের স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছে।

বন্যপ্রাণ ও বিস্ময়

ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারে অবস্থানের সময় সাইকেল ছেড়ে নৌকায় উঠতেই সুন্দরবন তার প্রকৃত রূপ মেলে ধরে। কাদামাটিতে রোদ পোহানো লবণজলের কুমির, গাছের ডালে দোল খাওয়া বানর আর পানির উপর ভেসে ওঠা ডলফিনের সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করে। উলফের কাছে পাখির বৈচিত্র্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ, পুরো ভ্রমণজুড়ে পাখির কলরব যেন এক অবিরাম সঙ্গীত হয়ে ছিল।

উলফ বিয়েরেন্স বলেন, একজন জীববিজ্ঞানী হিসেবে এই প্রতিবেশব্যবস্থার দৃঢ়তা নিজের চোখে দেখা সত্যিই বিনয়ী করে তোলে। এটি আমাদের শেখায়, নির্মিত পরিবেশে প্রকৃতিকে বাদ না দিয়ে বরং তাকে অন্তর্ভুক্ত করাই সবচেয়ে জরুরি।

মানুষ ও সংরক্ষণ

এই সফর শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল মানুষের উষ্ণতাও। স্থানীয় গ্রামগুলো দিয়ে সাইকেল চালানোর সময় তাঁরা পেয়েছেন মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। এমনকি হঠাৎ একটি গ্রামীণ বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগও হয়, যা সুন্দরবনের সঙ্গে এখানকার মানুষের গভীর সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ভ্রমণের একটি বড় অংশজুড়ে তাঁরা ওয়াইল্ডটিমের কাজ কাছ থেকে দেখেন। স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণে সংগঠনটির সক্রিয় ভূমিকা তাঁদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে।

নিলস ভ্যান ডেন বার্গে বলেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে ওয়াইল্ডটিম যে কাজ করছে, তা অসাধারণ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁদের ইকে সুন্দরবন জাদুঘর ও ব্যাখ্যা কেন্দ্র সচেতনতা তৈরির এক চমৎকার উদ্যোগ, যা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সংরক্ষণের অনুপ্রেরণায় রূপ দেয়।

ভবিষ্যতের নকশা

রাফায়েলের জন্য এই সফর ছিল স্থাপত্যের নতুন অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁরা স্থানীয় গেস্টহাউসে অবস্থান করেন এবং সেখানে থাকা সুযোগ-সুবিধার প্রশংসা করেন, যা বিশ্রাম ও ভাবনার সুযোগ করে দেয়—কীভাবে ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক পরিবেশ আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নকশাকে পথ দেখাতে পারে।

রাফায়েল আসকোলি বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ—হোক তা মিয়ানমারের বাঁশ বা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ—দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দাবি করে। সুন্দরবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের কাঠামোও হতে হবে এই গাছগুলোর শিকড়ের মতোই অভিযোজিত ও পরস্পরসংযুক্ত।

১৬০ কিলোমিটারের এই যাত্রা শেষ হলেও ‘প্রকৃতি-সম্মত’ এই পথিকৃৎদের সহযোগিতা কেবল শুরু। পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রকল্পে ফিরে গিয়ে তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের চেতনাকে—একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া বার্তা যে সবচেয়ে টেকসই নকশা সেইগুলোই, যা বন্য প্রকৃতিকে সম্মান জানায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সুপ্রিম কোর্টের বাধা পেরিয়ে ফিরছে ট্রাম্পের শুল্ক, চাপে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তা

ম্যাংগ্রোভের পথে যাত্রা: প্রকৃতি ও অনুপ্রেরণার চার দিনের অভিজ্ঞতা

০৬:১৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

বরিশালের ব্যস্ত সড়ক ছেড়ে সুন্দরবনের শান্ত, পান্না-সবুজ জলরাশির দিকে যাত্রা সহজ নয়—বিশেষ করে যদি সেই পথ পাড়ি দিতে হয় সাইকেলে। তবু টেকসই উন্নয়নে নিবেদিত তিনজন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞের কাছে ২৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাইকেল যাত্রা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে কাছ থেকে দেখার এক আদর্শ প্রস্তুতি।

এই ভ্রমণ কেবল দর্শনীয় স্থান দেখা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল প্রকৃতি-সম্মত নির্মাণ ধারণা নিয়ে এক যৌথ চিন্তার মিলনমেলা।

এই দলে ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের তিনজন বিশেষজ্ঞ। নেদারল্যান্ডসের জীববিজ্ঞানী ও পাখিপ্রেমী উলফ বিয়েরেন্স, নেদারল্যান্ডসের পরিবেশবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলস ভ্যান ডেন বার্গে এবং বাঁশের আবাসন নিয়ে কাজ করা ফরাসি স্থপতি রাফায়েল আসকোলি।

ভিন্ন পেশাগত পটভূমি হলেও তাঁদের লক্ষ্য এক—মা প্রকৃতিকে মাথায় রেখে নির্মাণ। উলফ ও নিলস নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘ইজি হাউজিং’-এ, যা উগান্ডা ও কেনিয়ায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও কার্বন-নিরপেক্ষ ঘর নির্মাণে কাজ করছে। অন্যদিকে রাফায়েল নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘হাউজিং নাউ’-এ, যা মিয়ানমারে টেকসই বাঁশের স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছে।

বন্যপ্রাণ ও বিস্ময়

ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারে অবস্থানের সময় সাইকেল ছেড়ে নৌকায় উঠতেই সুন্দরবন তার প্রকৃত রূপ মেলে ধরে। কাদামাটিতে রোদ পোহানো লবণজলের কুমির, গাছের ডালে দোল খাওয়া বানর আর পানির উপর ভেসে ওঠা ডলফিনের সৌন্দর্য তাঁদের মুগ্ধ করে। উলফের কাছে পাখির বৈচিত্র্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ, পুরো ভ্রমণজুড়ে পাখির কলরব যেন এক অবিরাম সঙ্গীত হয়ে ছিল।

উলফ বিয়েরেন্স বলেন, একজন জীববিজ্ঞানী হিসেবে এই প্রতিবেশব্যবস্থার দৃঢ়তা নিজের চোখে দেখা সত্যিই বিনয়ী করে তোলে। এটি আমাদের শেখায়, নির্মিত পরিবেশে প্রকৃতিকে বাদ না দিয়ে বরং তাকে অন্তর্ভুক্ত করাই সবচেয়ে জরুরি।

মানুষ ও সংরক্ষণ

এই সফর শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল মানুষের উষ্ণতাও। স্থানীয় গ্রামগুলো দিয়ে সাইকেল চালানোর সময় তাঁরা পেয়েছেন মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। এমনকি হঠাৎ একটি গ্রামীণ বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগও হয়, যা সুন্দরবনের সঙ্গে এখানকার মানুষের গভীর সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ভ্রমণের একটি বড় অংশজুড়ে তাঁরা ওয়াইল্ডটিমের কাজ কাছ থেকে দেখেন। স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণে সংগঠনটির সক্রিয় ভূমিকা তাঁদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে।

নিলস ভ্যান ডেন বার্গে বলেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে ওয়াইল্ডটিম যে কাজ করছে, তা অসাধারণ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁদের ইকে সুন্দরবন জাদুঘর ও ব্যাখ্যা কেন্দ্র সচেতনতা তৈরির এক চমৎকার উদ্যোগ, যা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সংরক্ষণের অনুপ্রেরণায় রূপ দেয়।

ভবিষ্যতের নকশা

রাফায়েলের জন্য এই সফর ছিল স্থাপত্যের নতুন অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁরা স্থানীয় গেস্টহাউসে অবস্থান করেন এবং সেখানে থাকা সুযোগ-সুবিধার প্রশংসা করেন, যা বিশ্রাম ও ভাবনার সুযোগ করে দেয়—কীভাবে ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক পরিবেশ আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নকশাকে পথ দেখাতে পারে।

রাফায়েল আসকোলি বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ—হোক তা মিয়ানমারের বাঁশ বা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ—দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দাবি করে। সুন্দরবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের কাঠামোও হতে হবে এই গাছগুলোর শিকড়ের মতোই অভিযোজিত ও পরস্পরসংযুক্ত।

১৬০ কিলোমিটারের এই যাত্রা শেষ হলেও ‘প্রকৃতি-সম্মত’ এই পথিকৃৎদের সহযোগিতা কেবল শুরু। পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রকল্পে ফিরে গিয়ে তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের চেতনাকে—একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া বার্তা যে সবচেয়ে টেকসই নকশা সেইগুলোই, যা বন্য প্রকৃতিকে সম্মান জানায়।