ধারণা করা হয়, সুন্দরবনে বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০টি বাঘ রয়েছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় এই বাঘগুলো মানুষের বসতির আরও কাছাকাছি চলে আসছে, যার ফল অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান সমুদ্র সুন্দরবনকে গ্রাস করছে, আর সেই সঙ্গে বাঘদের ঠেলে দিচ্ছে মানুষের আরও কাছে।
‘আমি আমার হাতটা বাঘের মুখের ভেতরে দেখতে পেয়েছিলাম!’ বলছিলেন আবু সালেহ। ‘ভাটার সময় নৌকায় করে একা বনে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কাছেই আরেকটা নৌকা ছিল। নদীর পাড়ে নোঙর করে মাছের ফাঁদ পেতে জোয়ারের অপেক্ষা করছিলাম।’ কথা বলতে বলতে তিনি তাঁর নীল টিনের ঘরের কাঠের বারান্দায় বসে জলমগ্ন মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হাওয়ায় লবণের গন্ধ। স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর পানি আরও লবণাক্ত হচ্ছে, বন্যা বাড়ছে, ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে আরও ভয়ংকর আর বাঘ চলে আসছে আরও কাছে। ‘আমার পিঠ বনের দিকে ছিল। হঠাৎ বাঘটা ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁধে নখ বসিয়ে দেয়। আমি ঘুরে ওর চোখের দিকে তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে আঘাত করতেই ও কাদায় পড়ে যায়।’ কয়েক মুহূর্তের সেই বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে সালেহর কণ্ঠ চড়া হয়ে ওঠে। ‘এরপরই আবার আক্রমণ করে, তখনই আমার হাতটা ওর মুখে ঢুকে যায়।’
‘অন্য হাতে একটা লাঠি ছিল। যত জোরে পারি আঘাত করতে থাকি। কামড়াতে কামড়াতে আর আঁচড়াতে আঁচড়াতে শেষে বাঘটা ছেড়ে দিয়ে বনের ভেতরে দৌড়ে যায়।’ একটু থেমে তিনি পেছনে ম্যানগ্রোভের দিকে তাকালেন। যেন নিশ্চিত হচ্ছিলেন, বাঘটা শুনছে না তো। ‘কেন জানি না, আমি ওর পেছনে দৌড়াই। আবার আক্রমণ করে। প্রায় ত্রিশ মিনিট আমরা লড়াই করেছি। ও কামড়াতে থাকলে আমি লাঠি দিয়ে মারতে থাকি। শেষমেশ ও সরে যায়। আমি চিৎকার করিনি, শুধু লড়েছি। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পর সাহায্যের জন্য চিৎকার করি।’

‘আমি রক্তে ভেসে গিয়েছিলাম—আমার আর বাঘের। আরেক জেলে আমার ডাক শুনে সাহায্য করতে আসে।’
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর বঙ্গোপসাগরের উপকূলে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। অসংখ্য নদীখাল জালের মতো ছড়িয়ে আছে, আর ভাটার সময় কাদার ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকে লাখো ধারালো শ্বাসমূল। ভয় আরও বাড়ায় বিশাল কুমির, দৈত্যাকার সাপ আর মানুষখেকো হিসেবে কুখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
সুন্দরবনে শুধু বাঘই থাকে না। সাত মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, যাদের অনেকেই দরিদ্র জেলে ও কৃষক, জীবিকার জন্য এই বনের ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ বা মধু খুঁজতে গিয়ে মানুষ ও বাঘের মুখোমুখি হওয়া নতুন নয়। কিন্তু পানি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। সালেহ বললেন, ‘গত বছর শুধু আমি নই, এখানে আরও অনেকেই বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছে। পাশের গ্রামের অনুকুলকে বাঘ মেরে ফেলেছে। গত কয়েক বছরে এমন ঘটনা অনেক।’
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এই ঘনত্বের কারণেই এখানে মানুষ-বাঘ সংঘাত প্রবল। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শুধু বাংলাদেশের অংশেই বাঘের আক্রমণে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
এই পরিসংখ্যানের একজন জাজন্তী বিশ্বাসের স্বামী। লাল-নীল শাড়ি পরা ৩৫ বছরের জাজন্তী মাথা নিচু করে সেই দিনের কথা বলেন। ‘আমার স্বামী শাপন কাঁকড়া ধরতেন। তখন আমাদের সংসারের বয়স সাত বছর, দুই সন্তান। সেদিন চারজনের সঙ্গে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। সবাই কাছাকাছি ছিল। বাঘ পেছন দিক থেকেই আসে। স্বামী সাহায্যের জন্য চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু সব শেষ হতে সময় লাগেনি। বাঘ ওকে মেরে ফেলেছিল।’
কমছে বনভূমি
কেন সুন্দরবনের বাঘ মানুষের ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আগে মনে করা হতো, পানির লবণাক্ততা বাঘের আচরণ বদলে দেয়। এখন ধারণা বদলেছে। কম শিকার, দুর্গম ভূখণ্ড আর বনে মানুষের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় মানুষ সহজ শিকার হয়ে উঠছে।

আর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সালেহ বলেন, ‘আমি এখানেই বড় হয়েছি। গত দশ বছরে দেখেছি পানি অনেক বেড়েছে। জমি আর বন কমে যাচ্ছে, সব পানির নিচে চলে যাচ্ছে। কেন জানি না। হয়তো উজানে বাঁধ খুলে ভারত বাংলাদেশ ডুবিয়ে দিচ্ছে?’ পরে যোগ করেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ও আগের চেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, বন ধ্বংস হচ্ছে।’
ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশ ডুবিয়ে দিচ্ছে—এ কথা ভুল হলেও পানি বাড়া আর ঘূর্ণিঝড় শক্তিশালী হওয়ার বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা সুন্দরবনকে ক্ষয় করছে এবং বাঘদের মানুষপাড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশক থেকে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি হারে বেড়েছে। নাসার স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, এই শতাব্দীর শুরু থেকে সুন্দরবনে প্রতি বছর গড়ে তিন সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। এক মিটারেরও কম উচ্চতায় থাকা এই বনে কয়েক সেন্টিমিটারই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
পারুল বীরের স্বামীও বাঘের আক্রমণে নিহত হন। তিনি বলেন, ঘটনার পর সমাজ থেকে কোনো সহায়তা পাননি। তিন মাস পর সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলেও মারা যায়। জীবিকার উপায় না থাকায় এখন তাঁকে নিজেই বনে মাছ ধরতে যেতে হয়। তিনি বলেন, ‘বাঘ আমার শত্রু নয়। কিন্তু বাঘের হাতে প্রিয়জন হারানো খুব কষ্টের।’
২০১১ সালে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে নুরেজ্জামান সানাও বাঘের আক্রমণের শিকার হন। ‘ঘাড়ের পেছনে চোয়াল বসিয়েছিল।’ তাঁর স্ত্রী চান না তিনি বনে যান, কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। তাঁর ছেলে মুস্তাকিম সানা বাবাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে।
পানি বাড়ায় শুধু বাঘ নয়, কুমিরের মতো প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের সংঘাত বাড়ছে। সাইফুল এমন এক জায়গায় কুমিরের আক্রমণের শিকার হন, যেখানে আগে বড় কুমির দেখা যেত না। আধা ঘণ্টা ধরে টানাহেঁচড়ার পর তাঁকে বাঁচানো হয়।
লবণাক্ততা বাড়ছে
সমুদ্রের সঙ্গে সঙ্গে লবণও ঢুকছে। ১৯৮৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবনে মাটির লবণাক্ততা গড়ে ছয় গুণ বেড়েছে, কোথাও কোথাও ১৫ গুণ। এতে কৃষিজমি যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বনও মারা যাচ্ছে। সুন্দরী গাছ, যাদের কম লবণ দরকার, গত ৭০ বছরে ৭৬ শতাংশ কমে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন পানি আর লবণই বাড়াচ্ছে না, আবহাওয়াকেও করছে আরও রুদ্র। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ছে। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ১৯৮০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এখানে পানির তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের আট গুণ হারে বেড়েছে। ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পান সুন্দরবনের বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়।
হিমালয়ের হিমবাহ সঙ্কোচন আর উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীতে পলি কমছে। ফলে উপকূলে প্রতিবছর কোথাও কোথাও ৪০ মিটার পর্যন্ত ভূমি হারাচ্ছে সুন্দরবন।

এই সব মিলিয়ে গবেষণা বলছে, ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে বাঘের উপযোগী বাসস্থান আর নাও থাকতে পারে। বাংলাদেশ একা বৈশ্বিক উষ্ণতা ঠেকাতে পারবে না, তবে বাঘ-মানুষ সংঘাত কমাতে ও বন রক্ষায় কিছু উদ্যোগ চলছে।
২০২৩ সালে সরকার বন আর বসতির সীমান্তে নাইলনের জাল বসানোর পরিকল্পনা নেয়। ভারতে এই পদ্ধতিতে সংঘাত কমেছে। পাশাপাশি ৪৯টি বাঘ প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
তবে জাল বসালেও দ্রুত হারিয়ে যাওয়া বন ফিরিয়ে আনার সমাধান হয় না। এ কাজে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় সংগঠনগুলো। নামিতা মণ্ডল জানান, তিনি ম্যানগ্রোভ চারা উৎপাদন করে জীবিকা গড়েছেন। আগে সবাই ঝুঁকি নিয়ে বনে যেত, এখন নারীরাও আয় করতে পারছেন। বেডস নামের সংগঠন ইতিমধ্যে দশ লক্ষের বেশি গাছ লাগিয়েছে। ভারতে আরও কোটি কোটি গাছ রোপণ হয়েছে।
শেষ বিকেলে কমলা আলোয় শিশুরা ক্রিকেট খেলছিল। শুশান্ত ও তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে বসে শুনছিলাম বাঘের সেই দিনের গল্প, যেদিন শুশান্ত আক্রান্ত হন আর পরে তাঁর মা নিহত হন। তিনি বললেন, ‘পানি বাড়ছে বলেই বাঘ কাছে আসছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা তুলতেই সবাই নীরব। কেউই এই শব্দ শোনেনি। কিছুক্ষণ ভেবে শুশান্ত বললেন, ‘আমরা সুন্দরবনের মানুষ। সুন্দরবন আমাদের মা, বাঘের ঘর। তাই ধনী দেশগুলোর উচিত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটিয়ে সুন্দরবন ধ্বংস করা বন্ধ করা।’
শব্দ ও আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট বাটলার
স্টুয়ার্ট বাটলার 


















