আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস দ্য সান অলসো রাইজেস-এ একটি বিখ্যাত সংলাপ আছে—দেউলিয়া হওয়া কীভাবে ঘটল? উত্তর: ধীরে ধীরে, তারপর হঠাৎ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনেকেরই মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের ক্ষেত্রে বিশ্ব এখন সেই “হঠাৎ” পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভাঙন ও কানাডার সতর্কবার্তা
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক আলোচনায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় একটি বড় “ছেদ” সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, যে সমঝোতার ওপর এতদিন ভর করে বিশ্ব চলছিল, তা আর কার্যকর নয়। এর ফলে কানাডার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া আর বিকল্প থাকছে না।
কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। তবু কার্নির বক্তব্য ছিল দৃঢ়: যখন নিয়ম আপনাকে রক্ষা করে না, তখন আপনাকেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী আচরণের মুখে দাঁড়িয়ে এমন অবস্থান নেওয়া অন্য অনেক দেশের ভাবনারই প্রতিফলন।
কার্নি তাঁর “ঝুঁকি হ্রাস” কৌশলও ব্যাখ্যা করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, গত ছয় মাসে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মেরকোসুর, কাতারসহ একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি—এমনকি সাম্প্রতিক ও বিতর্কিতভাবে চীনের সঙ্গেও সহযোগিতা—এই পথেই কানাডা এগোচ্ছে।
ইউরোপ-ভারত চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
এই সপ্তাহে স্বাক্ষরিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তিকে অনেকেই বলছেন “সবচেয়ে বড় চুক্তির জননী”। লক্ষ্য হলো ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইউরোপের রপ্তানি দ্বিগুণ করা। এর আগে মেরকোসুর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিও একই উদ্দেশ্যে—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো।
ভারত ও মেরকোসুরের সঙ্গে এই চুক্তিগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কয়েক দশক ধরে এগুলো নিয়ে টালবাহানা চলছিল। হঠাৎ করেই চূড়ান্ত হওয়া দেখাচ্ছে ইউরোপের মনোভাবের পরিবর্তন।

ব্রিটেন-চীন সম্পর্ক ও নতুন বাস্তবতা
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক চীন সফরও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের পর এটি ছিল কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও ব্রিটেন যতটা যোগাযোগ রাখত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে তার চেয়ে কম ছিল বলে ধারণা করা হয়।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। স্টারমার অবশ্য সতর্ক অবস্থান নেন, তবে স্বীকার করেন যে চীনের প্রতি কেবল দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে চলেছে এবং পার্থক্য থাকলেও তা পরিণতভাবে সামলাতে হবে। পেছনের বাস্তবতা স্পষ্ট—ক্রমশ অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি কমানো।
ইউরোপের দ্বিধা ও নীরব ভারসাম্য
কানাডা যেখানে স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঝুঁকি কমানোর কথা বলছে, সেখানে ব্রিটেন ও ইউরোপের অনেক দেশ এখনো সাবধানী। তারা ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে চায় না। তবু বাস্তবে তারা ভারসাম্য রক্ষা করছে। স্টারমারের সফরে ৫০ জনের বেশি ব্যবসা ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন, যা নতুন সুযোগের ইঙ্গিত দেয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস, আয়ারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের নেতাদের সাম্প্রতিক বা আসন্ন চীন সফরও একই বার্তা বহন করে—নীরবে হলেও বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে।
চীনকে ঘিরে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
আজকের প্রেক্ষাপটে চীনের নেতারা হয়তো কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গেই দেখছেন, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন ঝুঁকিপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং চীনকে দেখা হচ্ছে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অংশীদার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার সমর্থক হিসেবে।
এই পরিবর্তন হঠাৎ মনে হলেও বাস্তবে বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ জমছিল। গবেষণা দেখায়, ২০০০ সালের পর থেকে লাতিন আমেরিকায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব ১৫ গুণ বেড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অর্ধেকে নেমেছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে শক্তির স্থানান্তর
যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অঞ্চলে চীনের এই উত্থান এত স্পষ্ট হয়, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া বা আফ্রিকার মতো অঞ্চলে এর প্রভাব আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৫ সালের পর উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্য ছয় গুণ বেড়েছে, কিন্তু দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ।
তবু সবাই প্রকাশ্যে সাহস দেখাবে—এমনটা এখনই বলা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও ট্রাম্পের প্রতিশোধপরায়ণ ভাবমূর্তি অনেক দেশকেই সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে। তাছাড়া ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণ অনেক নেতাকে অপেক্ষা করে দেখার নীতিতে রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁর শুল্ক হুমকির মাত্র এক-চতুর্থাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপসহ অনেক দেশ এখনো পুরো চাপ অনুভব না করায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু মার্ক কার্নির বার্তা স্পষ্ট—হুমকি দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রশ্ন হলো, আর কত দেশ এই বাস্তবতা স্বীকার করতে প্রস্তুত? একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্বের বড় অংশে চীন ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা নিচ্ছে, এবং এই পরিবর্তন অনেকের ধারণার চেয়েও অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















