যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে ইরানের। পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে সময় ফুরিয়ে আসছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর যেকোনো হামলার জবাবে ‘ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তেহরান। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করায় কূটনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি ও সামরিক প্রস্তুতি
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি জানিয়েছেন, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং এক হাজার নতুন কৌশলগত ড্রোন সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ ইউনিটে যুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা হলে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর ও ধ্বংসাত্মক। একই সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ও পারমাণবিক চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌবহর পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইরানে আঘাত হানতে তারা প্রস্তুত। তার দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, এই কর্মসূচির আড়ালে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চলছে। এর আগে গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর পদক্ষেপ
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন ও সহিংস অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লায়েন এই সিদ্ধান্তকে বহুদিনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেন। ইউরোপীয় পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ কর্মকর্তা কাজা কালাস বলেন, যারা সন্ত্রাসীর মতো আচরণ করে, তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রসিকিউটর জেনারেল এবং একাধিক বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
ইরান সতর্ক করে বলেছে, এই ঘোষণার পরিণতি হবে ধ্বংসাত্মক। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো, পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, ইরানে কোনো মার্কিন হামলা হলে গোটা অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে
তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যস্থতার উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে তুরস্ক। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরের সময় আঙ্কারা এই উদ্যোগ নিতে চায়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরানের ওপর হামলা ভুল সিদ্ধান্ত হবে এবং পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনায় ফেরার পথ এখনও খোলা। একই সঙ্গে ন্যাটোভুক্ত দেশ তুরস্ক ইরান সীমান্তে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে। ইরানের মিত্র রাশিয়াও জানিয়েছে, আলোচনা এখনও সম্ভব এবং শক্তি প্রয়োগ পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেবে।

মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
এই উত্তেজনার মধ্যে গাজায় মানবিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। এদিকে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরানের বিক্ষোভকারীদের পরিস্থিতির চেয়ে পারমাণবিক ইস্যুই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















