চীনে চার দিনের সফরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন গতি আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বেইজিং থেকে সাংহাই অভিমুখে ব্যবসায়িক বহর
স্টারমারের সফরের অংশ হিসেবে ৫৪টি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল বেইজিং থেকে সাংহাইয়ে যাচ্ছে। চীন-ব্রিটেন ব্যবসা পরিষদের প্রধান নির্বাহী পিটার বার্নেট জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় সাংহাইয়ে একটি সংবর্ধনায় অংশ নেবে এই দল। শনিবার একটি ব্যবসা ফোরাম ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে প্রতিনিধি দলটি চীন ত্যাগ করবে।
এই সফরের মধ্যেই নতুন কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে বলে জানান বার্নেট। এর মধ্যে জিয়াংসু প্রদেশের সুঝৌ শহরের সঙ্গে চীন-ব্রিটেন ব্যবসা পরিষদের একটি সমঝোতা স্মারক উল্লেখযোগ্য, যার মাধ্যমে একটি উদ্ভাবনী কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চীনে সম্প্রসারণে আগ্রহী স্টার্টআপগুলোর জন্য সুঝৌকে একটি স্বাগতপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ‘রিসেট’ কৌশল
এই সফরকে স্টারমারের বাস্তবধর্মী সম্পর্ক পুনর্গঠনের কৌশলের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা এবং একই সঙ্গে চীনকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখার নীতির ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের মধ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পিটার বার্নেট বলেন, দীর্ঘ আট বছর ধরে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর না হওয়াটা প্রায় দায়িত্বহীনতার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। তাই এই সফরকে তিনি স্বস্তিদায়ক ও আশাব্যঞ্জক বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এই সফর দুই পক্ষের মধ্যেই আস্থার বার্তা দিয়েছে এবং চীনে ব্যবসা কার্যক্রমে রাজনৈতিক সমর্থনের ইঙ্গিত স্পষ্ট করেছে।
স্কচ হুইস্কিতে শুল্ক কমানো
সফরের একটি বড় সাফল্য হিসেবে ঘোষণা আসে যে চীন স্কচ হুইস্কির আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করবে। এর ফলে আগামী পাঁচ বছরে ব্রিটিশ রপ্তানিকারকেরা প্রায় ২৫ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করতে পারবেন। এই সিদ্ধান্তে বিশেষ করে হুইস্কি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সন্তুষ্ট বলে জানান বার্নেট। অন্য অনেক দেশ যেখানে এমন সুবিধা পায়নি, সেখানে যুক্তরাজ্যের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
বাণিজ্যিক চুক্তি ও প্রতিবন্ধকতা কমানোর উদ্যোগ
চীন ও যুক্তরাজ্য বৃহস্পতিবার মোট ১০টি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কমিশনের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হয়েছে এবং চীনে ব্রিটিশ পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর পথ সুগম হয়েছে। বিলাসবহুল পোশাক ব্র্যান্ড, খাদ্য ও পানীয় রপ্তানিকারক এবং স্বাস্থ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই উদ্যোগে উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ হলে বিভিন্ন পণ্যের অনুমোদন দ্রুত পাওয়া যাবে, যা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি চাহিদা ছিল।
উচ্চপর্যায়ের ব্যবসা পরিষদ বৈঠক
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল যুক্তরাজ্য-চীন ব্যবসা পরিষদের বৈঠক। এতে দুই দেশের সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রায় ১৬০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। পণ্য ও সেবা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ নিয়ে এই আলোচনাকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই বৈঠকে সেবা খাতে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে সেবা খাতের বড় ভূমিকা থাকায় আর্থিক খাতের পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্প, পর্যটন ও স্বাস্থ্যসেবাও এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বে সেবা রপ্তানিতে যুক্তরাজ্য দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং চীনে এই খাতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
চীনা ও ব্রিটিশ শীর্ষ ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি
বৈঠকে চীনের দিক থেকে উপস্থিত ছিলেন প্রযুক্তি, ওষুধ, ব্যাংকিং ও খুচরা বাণিজ্য খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা। ব্রিটিশ পক্ষ থেকেও গাড়ি শিল্প, ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও শিক্ষা খাতের নেতারা অংশ নেন।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বলেন, পঞ্চদশ পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চীন-যুক্তরাজ্য সহযোগিতার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। তিনি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক পরিবেশ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
আর্থিক খাতে নতুন সমঝোতা
বেইজিংয়ে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ ও চীনের শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, তথ্য বিশ্লেষণ, সীমান্তপারের মুদ্রা ব্যবহার, টেকসই অর্থায়ন ও আর্থিক উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
এই চুক্তিকে দুই দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
সফরের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল চীনের বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। পাশাপাশি একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২০৩০ সাল পর্যন্ত চীনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
সব মিলিয়ে, স্টারমারের এই সফর চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে নতুন বাস্তবধর্মী পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমীকরণ কীভাবে এগোয়, সেটাই এখন নজরের কেন্দ্রে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















