বিশ্ববাজারে সোনার দামের ঊর্ধ্বগতি
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছায়। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সোমবার প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং অল্প সময়ের জন্য পাঁচ হাজার পাঁচশ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামেও বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া যাওয়ার পর সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎ কমে যায়। তবুও এক বছর আগের তুলনায় এসব ধাতুর দাম এখনো অনেক বেশি।
ট্রাম্পের নীতিতে বিনিয়োগের দিক পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। যেসব দেশকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল মনে করেননি, তাদের ওপর শুল্ক আরোপের ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সোনার চাহিদা বাড়িয়েছে।
জানুয়ারিতে ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকির পর বিশ্ব শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটে এবং একই সময়ে সোনা ও রুপার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে।
যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা
ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ সোনার দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
গ্রিনল্যান্ড দখলসংক্রান্ত ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এতে মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝোঁকে। ট্রাম্পের শাসনামলে ঘোষিত শুল্কনীতির পর ডলার তার সবচেয়ে বড় দরপতনের মুখে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ভূমিকা
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক সোনা কেনাও দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। অনেক দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ডলারের পরিবর্তে সোনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা কমানোর একটি কৌশলও কাজ করছে।

বিশেষ করে রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক দেশকে নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে সোনার দিকে আকৃষ্ট করেছে। যদিও ২০২২ সালের পরের তুলনায় ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার গতি কিছুটা কমেছে।
চীন এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোনা ক্রেতা। দেশটিতে গয়না ও বিনিয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই সোনার চাহিদা বেশি। পাশাপাশি পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরাও সোনাভিত্তিক কোম্পানি ও তহবিলে বড় অঙ্কের অর্থ ঢেলেছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরাও বাজারে এসেছে, এমনকি কিছু ডিজিটাল মুদ্রা প্রতিষ্ঠান ছোট দেশের চেয়েও বেশি সোনা মজুত করছে।
হঠাৎ দাম কমার কারণ
সোনার দাম বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল আশঙ্কা—ট্রাম্প যদি এমন কাউকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান করেন, যিনি সুদের হার দ্রুত কমাতে চান, তাহলে ডলার দুর্বল হবে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এসব ঝুঁকি থেকে বাঁচতেই অনেকে সোনায় বিনিয়োগ করেছিলেন।
কিন্তু পরে জানা যায়, ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত একজন প্রার্থীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান করতে পারেন। এই খবরে বাজার কিছুটা আশ্বস্ত হয় এবং সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের দাম কমে যায়।
তবুও কেন সোনার আকর্ষণ কমেনি
দাম কমলেও সোনা এখনো গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি দামে রয়েছে। চলমান যুদ্ধ, বিদ্যমান ও সম্ভাব্য নতুন শুল্ক, এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা ধরে রেখেছে।
সোনার একটি বড় শক্তি হলো এর সীমিত সরবরাহ। এটি কোনো দেশের ঋণ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই অনিশ্চিত বিশ্বে সোনা এখনো একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ওঠানামা দেখিয়ে দিয়েছে, অন্য পণ্যের মতো সোনার দামও দ্রুত বাড়তে পারে আবার দ্রুত কমতেও পারে।
বাংলাদেশে সোনার দামে বড় পতন
বিশ্ববাজারের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। শনিবার দেশে আবারও বড় ধরনের দাম কমেছে। এক দিনে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা কমানো হয়। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে ২২ ক্যারেট সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিতে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা।
২১ ক্যারেট সোনার দাম এখন ভরিতে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা। ১৮ ক্যারেট সোনার দাম ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্রেতাদের এসব দামের সঙ্গে পাঁচ শতাংশ ভ্যাট এবং ন্যূনতম ছয় শতাংশ মজুরি দিতে হবে।
এর আগে ৩০ জানুয়ারি ভরিতে ১৪ হাজার ৬৩৮ টাকা কমানো হয়েছিল। টানা দুই দফা কমানোর ফলে মাত্র দুই দিনে মোট ৩০ হাজার ৩৮৪ টাকা কমেছে সোনার দাম।
এরও আগে ২৯ জানুয়ারি ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকায় উঠেছিল। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৮ বার সোনার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ বার দাম বেড়েছে এবং পাঁচ বার কমেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















