কারাকাসের এক নির্মাণশ্রমিক ফিসফিস করে বলছিলেন, যেন বহুদিনের বন্ধ নালার মুখ খুলে গেছে। ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এমন অনুভূতি ছড়িয়েছে অনেকের মধ্যেই। নিকোলাস মাদুরোর অপসারণে মানুষের মনে স্বস্তি এলেও উচ্ছ্বাস চাপা। কারণ শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট। তাঁর ডেপুটি দেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতার হাল ধরেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। তবু জরিপ বলছে, পাঁচজনের মধ্যে চারজন ভেনেজুয়েলাবাসী মনে করছেন এক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে।
অর্থনৈতিক স্বস্তির ইঙ্গিত
এই আশাবাদের বড় কারণ অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক নড়াচড়া। জানুয়ারিতে মাদুরোর পতনের পর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেলের চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল যাচ্ছে এবং আরও অর্থ আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মুদ্রাবাজারে। সরকারি ও সমান্তরাল বিনিময় হারের ব্যবধান কমে এসেছে, মূল্যস্ফীতির ভয়ও কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। সরকার রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলছে এবং বাজারমুখী পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দিচ্ছে।
তেল ও খনিজ খাতে সংস্কারের ঘোষণা
জাতীয় পরিষদে হাইড্রোকার্বন আইন সংশোধনের প্রাথমিক অনুমোদন মিলেছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। রয়্যালটি কমানো ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন সালিশির সুযোগও রাখা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি ইতিবাচক বার্তা। একই পথে খনিজ আইন সংস্কারের কথাও উঠেছে, যাতে বৈদেশিক পুঁজি আকর্ষণ করা যায়।
অর্থনীতি বনাম গণতন্ত্রের প্রশ্ন
সরকারি বয়ানে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক মুক্তিই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে। তবে বিশ্ব ইতিহাসে এমন উদাহরণ আছে যেখানে শক্তিশালী অর্থনীতি গণতন্ত্র নিশ্চিত করেনি। অনেকের আশঙ্কা, শাসকগোষ্ঠী শক্ত অর্থনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিবর্তনের দাবি দুর্বল করতে চাইছে।
বন্দিমুক্তি ও সংলাপের প্রতিশ্রুতি
শাসনব্যবস্থা প্রায় তিন শতাধিক রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে, যা স্বল্প সময়ে বিরল ঘটনা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিরোধী নেতাদের ঘনিষ্ঠজনও। সরকার সর্বদলীয় সংলাপের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। মন্ত্রিসভা ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেও কিছু রদবদল হয়েছে। এসব পদক্ষেপে ভয়ের আবহ কিছুটা কমেছে, প্রকাশ্যে প্রতিবাদ ও নতুন নির্বাচনের দাবি আবার শোনা যাচ্ছে।
বাস্তবতার কঠিন দেয়াল
তবু বাস্তব চিত্র এতটা উজ্জ্বল নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে এখনো শত শত রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে। মুক্তির শর্ত এতটাই কড়া যে অনেকের কণ্ঠ কার্যত রুদ্ধ। শাসনব্যবস্থার কঠোর মুখ হিসেবে পরিচিত মন্ত্রী ও নিরাপত্তা নেতৃত্ব বহাল রয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী দ্রুত নির্বাচন আহ্বানের বাধ্যবাধকতাও উপেক্ষিত। সমালোচকদের মতে, সংলাপের ঘোষণা সময় ক্ষেপণের পুরোনো কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও সময়ের খেলা
বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকার সময় টানতে চাইছে, আশায় আছে যে আন্তর্জাতিক চাপ ধীরে ধীরে কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কথা বলা হলেও সময়সীমা অস্পষ্ট। ধাপে ধাপে স্থিতিশীলতা, পুনরুদ্ধার ও রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। অতীতের উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে যেতে বছর লেগে যায়।
সামনে কোন পরীক্ষা
গণতন্ত্রে সত্যিকারের অগ্রগতির প্রথম পরীক্ষা হবে নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতাদের দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া এবং স্বাধীনভাবে রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করা। এর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও সর্বোচ্চ আদালতে সংস্কার জরুরি। আইন থাকলেই হবে না, সেগুলো কার্যকর করার মতো স্বাধীন মানসিকতার মানুষও দরকার।
অর্থনৈতিক খোলামেলা ভাব যতই আশার সঞ্চার করুক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে সেই আশার ভিত নড়বড়ে থেকে যায়। ভেনেজুয়েলার সামনে তাই প্রশ্ন একটাই—এই পরিবর্তন কি সত্যিকারের গণতন্ত্রের দিকে, নাকি কেবল সময় কেনার কৌশল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















