ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর খেরসনে এখন ঘরের বাইরে পা রাখাই মৃত্যুঝুঁকির নাম। আকাশে ভেসে থাকা ড্রোনের গুঞ্জন মানেই হঠাৎ নেমে আসতে পারে গ্রেনেড। তাই এই শহরে স্বাভাবিক জীবন আর মাটির ওপরে নেই, ধীরে ধীরে তা নেমে গেছে ভূগর্ভে।
একদিন ডে কেয়ার থেকে মেয়েকে নিতে গিয়ে তানিয়া লেশচেঙ্কো আগে চোখ রাখেন মোবাইলের একটি চ্যাট গ্রুপে। সেখানে কেউ সতর্কবার্তা দিলে তবেই বাইরে বের হওয়া যায়। অনেক সময় শুধু একটি বার্তাই যথেষ্ট আতঙ্ক ছড়াতে—ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। খেরসনে এমন শব্দ এখন নিত্যদিনের পটভূমি সঙ্গীত।
ডিনিপ্রো নদীর ওপার থেকে ছোড়া সস্তা কোয়াড কপ্টার ড্রোন পুরো শহরকে তাদের আওতায় রেখেছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে এসব হামলায় প্রায় দুই শত বেসামরিক মানুষ নিহত এবং দুই হাজারের মতো আহত হয়েছে। ইউক্রেনবাসীরা এই আক্রমণকে ডাকছে মানব শিকার নামে। বাগানে কাজ করা মানুষ, ফুটপাতে হাঁটা পথচারী কেউই নিরাপদ নন।
ড্রোনের ছায়ায় বদলে যাওয়া শহর
একসময় প্রশস্ত রাজপথ আর পুরোনো স্থাপত্যের জন্য পরিচিত খেরসনে এখন খোলা আকাশই সবচেয়ে ভয়ের জায়গা। শহরের জনসংখ্যা কমে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজারে নেমেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বেসামরিক মানুষের ওপর ড্রোন হামলার এমন ব্যাপক ব্যবহার পৃথিবীতে আর কোথাও দেখা যায়নি। জাতিসংঘ একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতায় শহরের জীবন নেমে গেছে মাটির নিচে। হাসপাতাল, মাতৃসদন, সরকারি দপ্তর, এমনকি থিয়েটার ও এখন ভূগর্ভে। শিশুদের খেলার মাঠ বদলে গেছে বেজমেন্টের কক্ষে। সেখানে রাখা হয়েছে বালুর বাক্স, যেন শিশুরা অন্তত মাটির স্পর্শ পায়। সব স্কুল চলছে অনলাইনে।

রক্ষার চেষ্টা, তবু অনিশ্চয়তা
ড্রোন ঠেকাতে নানা পদ্ধতি নেওয়া হলেও কোনোটিই পুরোপুরি কার্যকর নয়। নদীর তীরে বসানো হয়েছে জ্যামিং অ্যান্টেনা, রাস্তাজুড়ে টানানো হয়েছে জাল। ফুটপাতে বসানো হয়েছে কংক্রিটের আশ্রয়কক্ষ। মেরামত কাজে নামা কর্মীদের হাতে থাকে ড্রোন শনাক্তকারী যন্ত্র, যা ড্রোনের ক্যামেরার দৃশ্য ধরে ফেলে। নিজের গাড়ি বা শরীরকে সেই পর্দায় দেখা মানেই ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা।
একবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন শহরের সামরিক প্রশাসক ইয়ারোস্লাভ শাঙ্কো। ড্রোনের নজর এড়াতে তাকে সর্বোচ্চ গতিতে গলি বদলাতে হয়েছিল। অনেকের ক্ষেত্রে পালানোর সুযোগও থাকে না।
মানুষের গল্পে আতঙ্কের ছাপ
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা বহু আহত মানুষ জানান, ড্রোন একবার পিছু নিলে পালানোর আর পথ থাকে না। কেউ গেট খুলতে গিয়ে আহত হয়েছেন, কেউ গাছের চারপাশে ঘুরেও বাঁচতে পারেননি। কেউ কেউ পরে অনলাইনে ড্রোন হামলার ভিডিও দেখে নিজেদের আহত হওয়ার দৃশ্য দেখেছেন।
এই ড্রোন হামলার ভয় আরও বাড়িয়ে দেয় এর পেছনের মানুষের উপস্থিতি। আহতদের ভাষায়, যন্ত্রের ভেতর থেকে কেউ একজন খুঁজে খুঁজে লক্ষ্য ঠিক করছে। সেই অনুভূতিই সবচেয়ে ভয়ানক।
ভূগর্ভেই শৈশব ও ভবিষ্যৎ
স্কুল বন্ধ থাকায় ভূগর্ভের কার্যক্রম কেন্দ্রগুলো শিশুদের একমাত্র মিলনস্থল। নাচ, আঁকা, সিনেমা দেখার আয়োজন সেখানে। তবু অনেক পরিবার শহর ছাড়েনি। তানিয়া লেশচেঙ্কোর মতো অনেকেই মনে করেন, আশ্রয়কেন্দ্র আর সতর্কবার্তার ভরসাতেই এখানেই থাকতে হবে। বাস স্টপে পৌঁছে আবার চ্যাট গ্রুপে চোখ রাখেন তারা, তারপর সন্তানের হাত ধরে দ্রুত বাড়ির পথে হাঁটেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















