ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নতুন করে বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। কূটনীতি এখনো আলোচনার টেবিলে থাকলেও আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, ভুল হিসাব, অস্পষ্ট লক্ষ্য এবং কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে।
ওমান উপসাগরে সামরিক জটলা ও কূটনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর ইরানের নাগালের ভেতরে অবস্থান নেওয়ায় সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে। অন্যদিকে ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখালেও মূল কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। ফলে কূটনীতি ব্যর্থ হলে সংঘাতের ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।

শাসন পরিবর্তনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও স্থিতিশীল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। ইরানের ভূগোল, জনসংখ্যা, জাতীয়তাবাদ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহিরাগত হস্তক্ষেপকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় পরিণত করতে পারে। ইতিহাসও দেখায়, শাসন পরিবর্তন মানেই স্থিতি নয়; বরং তা নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরে জাতিগত বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাঙ্ক্ষা দেশটির জন্য ভেতর থেকে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আঞ্চলিক মিত্রজাল ও বহুমুখী সংঘাতের আশঙ্কা
ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো বড় সংঘাতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে লেবানন, ইরাক, ইয়েমেনসহ একাধিক ফ্রন্টে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা জোরদার করলেও তেল অবকাঠামো ও সমুদ্রপথ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বহুমুখী চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনা
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ইরান সরাসরি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের সামরিক আঘাত বা অস্তিত্বগত হুমকি দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য পথ এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা গভীর সংকটে পড়বে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সম্ভাব্য ধাক্কা
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অস্থিরতা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্ন এবং মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর বিভাজন আরও তীব্র হয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সামরিক সমাধানের বদলে কূটনৈতিক পথই স্থায়ী স্থিতির একমাত্র সম্ভাব্য উপায় হিসেবে সামনে আসছে।

উত্তেজনার মধ্যেও ভঙ্গুর কূটনৈতিক আশ্রয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনীতি এখনো শেষ আশ্রয়। তবে ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অনেক সময় ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি থেকেই শুরু হয়। তাই তেহরান ও ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়াতে পারে কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে অঞ্চল ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্থিতি।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















