বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতৃত্ব হিসেবে প্রায় দেড় দশক পার করা শি জিনপিং আবারও বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানের পথে হাঁটলেন। চীনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ঝাং ইউশিয়া এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্তের ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিস্ময় তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এক যুদ্ধবীরকে লক্ষ্য করে নেওয়া এই পদক্ষেপ বেইজিংয়ের ক্ষমতার ভেতরের অস্থিরতার ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট করেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে অনিশ্চয়তার ছায়া
মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের পেছনে একক কোনো কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। সম্ভাব্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ, সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি দমন কিংবা অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ নেতৃত্ব—সবকিছুই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সামনে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে এই সন্দেহপ্রবণতার বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে।
সামরিক নেতৃত্বে অস্থিরতার ইঙ্গিত
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যেই দল ও সামরিক কাঠামোর বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামরিক কমিশনে নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশ জেনারেল এখন আর পদে নেই। বিশ্বের বৃহত্তম সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
স্বৈরশাসনের ভেতরের বাস্তবতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বৈরশাসনব্যবস্থায় শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি সাধারণ জনগণ নয়, বরং তাঁর নিজের ঘনিষ্ঠ শক্তিকেন্দ্র। দক্ষ ও জনপ্রিয় সামরিক কমান্ডাররা বিকল্প প্রভাব তৈরি করতে পারেন, যা শাসকের সন্দেহ বাড়িয়ে তোলে। ফলে নিয়মিত শুদ্ধি অভিযান এমন ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবেই দেখা হয়।
গোয়েন্দা গুঞ্জন ও বাস্তব পরিস্থিতি
কিছু প্রতিবেদনে ঝাং ইউশিয়াকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ শোনা গেলেও এ ধরনের তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানাচ্ছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। একই সময়ে বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি নিয়ে চীনে জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে এবং পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও তথ্যসূত্র তৈরির প্রচেষ্টা জোরদার করছে। ফলে দুই শক্তির পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন নাকি ক্ষমতা সংহতি
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যেমন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক দলীয় বৈঠকে উপস্থিতির হার কমে যাওয়াকে এই অভিযানের ব্যাপকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাইওয়ান প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার হিসাব
শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন তাইওয়ান ইস্যুতে নীতিগত মতপার্থক্যের সম্ভাবনাও সামনে আনছে বলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দলীয় কংগ্রেসকে সামনে রেখে সম্ভাব্য বিরোধিতা ঠেকাতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার কৌশল হিসেবেও এই পদক্ষেপকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সম্ভাব্য চতুর্থ মেয়াদের পথ তৈরি করতে গেলে এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















