ভারতের নতুন প্রতিরক্ষা বাজেটকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য দ্বিগুণ অঙ্কের বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৭ সালের পর ধারাবাহিক পতনের ধারা ভেঙে বাজেটের আকার মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কৌশলগত দৃঢ়তার বার্তা দেয়। তবে এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হলে কেবল আংশিক পরিবর্তন নয়, বাজেট প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
বাজেটের ইতিবাচক ও সীমাবদ্ধ দিক
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রতিরক্ষা ব্যয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি এবং তা জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হওয়া, যা আগের বছরের ১.৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে বহু বছরের অবহেলা কাটিয়ে মূলধনী ব্যয় ২২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং রাজস্ব ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে। আধুনিকায়নের ওপর স্পষ্ট জোর দেখা যাচ্ছে—ভারতীয় বিমানবাহিনীর বরাদ্দ ৩২ শতাংশ এবং ভারী যান ও অস্ত্রের জন্য সেনাবাহিনীর বরাদ্দ প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও নৌবাহিনীর বরাদ্দ মাত্র ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে দেশীয় উৎপাদনে তাদের সাফল্য এবং বরাদ্দ অর্থ দ্রুত ব্যবহারের সক্ষমতা।

মুদ্রার দুর্বলতা ও ব্যয়ের চাপ
রুপির মান ডলারের বিপরীতে কমে যাওয়ায় যুদ্ধবিমানসহ আমদানিনির্ভর মূলধনী সরঞ্জাম কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—২০১৪ সালের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা থেকে গত বছর তা ২৩ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। সেনাবাহিনীর গতিশীলতা সংশ্লিষ্ট বহু সরঞ্জাম এখন দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানই তৈরি করছে। তবু এসব বাস্তবতা ঘোষিত দ্বিগুণ অঙ্কের বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দেয়।
পেনশন ব্যয়ও ৬.৫৬ শতাংশ বেড়েছে এবং মোট বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। অতীতে প্রতিরক্ষা পেনশন আলাদা খাতে থাকলেও এখন তা সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে, যা নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
আমলাতন্ত্র, বিলম্ব ও সংস্কারের প্রয়োজন
মূলধনী ক্রয়ের ৭৫ শতাংশ দেশীয় শিল্পের জন্য সংরক্ষিত রাখা ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রতিরক্ষা উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু জটিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, বিশেষ করে সর্বনিম্ন দরদাতা নীতির কারণে উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে তাদের টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিশ্চিত চাহিদা জরুরি।

গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্বও বড় সমস্যা। বহু বছর আগে অনুমোদিত সাবমেরিন প্রকল্পের সরবরাহ সময় এখন ২০৩০-এর দশকে গড়িয়েছে। যুদ্ধবিমান চুক্তিতেও একই ধরনের বিলম্ব দেখা গেছে। ফলে নির্ধারিত অর্থ সময়মতো ব্যয় না হওয়ায় বড় অঙ্কের বরাদ্দ ফেরত দিতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের জন্য স্থায়ী তহবিল গঠনের পুরোনো প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গবেষণা ও উন্নয়নে বিচ্ছিন্নতা
প্রতিরক্ষা গবেষণায় বরাদ্দ বাড়লেও গবেষণা কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি থেকেও প্রত্যাশিত সামরিক সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। জিডিপির তুলনায় ভারতের সামগ্রিক গবেষণা ব্যয় এখনও খুব কম, যেখানে উন্নত দেশগুলো অনেক বেশি বিনিয়োগ করছে এবং বেসরকারি খাত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীর আরও উদ্যোগী হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে—কম হুমকির মুখে থাকা দেশও উচ্চ বরাদ্দ দিচ্ছে। তাই প্রতিরক্ষা বাজেটকে উন্নয়নবিরোধী খাত হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখা দরকার।
উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে প্রতিরক্ষা
সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে দেশীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্প—প্রতিরক্ষা খাত কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। সহায়ক শিল্পগুলোর বিস্তারের মাধ্যমে এটি বহুগুণ অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিরক্ষা বাজেটকে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে প্রক্রিয়াগত সংস্কারও স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















