গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখে বিশ্বের বহু দেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সমালোচনামূলক কণ্ঠকে থামাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে নানাভাবে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দুর্নীতির বিস্তারে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ বলছে, যেখানে সংবাদমাধ্যম দুর্বল হয়, সেখানে আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার দ্রুত বেড়ে যায়।
সার্বিয়ার ঘটনা ও আতঙ্কের বাস্তবতা
একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে বহু মানুষের মৃত্যু ঘিরে সার্বিয়ায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। স্বাধীন সাংবাদিকেরা সেই ঘটনার প্রতিবেদন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন। বহু ক্ষেত্রে হামলাকারীরা শাস্তি পায়নি, ফলে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা আরও উৎসাহিত হয়েছে। একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, কুৎসা রটনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়ে তাদের কাজ কঠিন করে তোলা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি
আন্তর্জাতিক সূচকগুলো দেখায়, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। এখন বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশে সাংবাদিকতার পরিবেশ কঠিন বা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে গেলে পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি বাড়ার প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমালোচনামূলক নজরদারি না থাকলে ক্ষমতাসীনদের অনিয়ম গোপন রাখা সহজ হয়।
ক্ষমতা, জনতাবাদ ও দুর্নীতির চক্র
বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনতাবাদী রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম দমন এবং দুর্নীতি একে অন্যকে শক্তিশালী করে। সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে দুর্বল করা হলে নীতিনির্ধারণে যুক্তির বদলে আবেগের ব্যবহার বাড়ে, আর সেই পরিবেশ দুর্নীতির পথ খুলে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হলেও ক্ষতি গভীর হয়।
সাংবাদিক দমনে নতুন কৌশল
বর্তমানে সাংবাদিকদের কারাবন্দি না করেও দমন করার নানা উপায় ব্যবহার করা হচ্ছে। সমালোচনামূলক সাংবাদিকদের রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া, দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে আর্থিক চাপ সৃষ্টি, কর বা নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার এবং অনলাইন নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি ও সহিংসতার হুমকি ও বেড়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও টিকে থাকার লড়াই
বেশিরভাগ দেশের সংবাদ মাধ্যমের আর্থিক স্থিতি দুর্বল। সরকারি বিজ্ঞাপন অনুগত প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে থাকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক চাপ এড়াতে সমালোচনামূলক গণমাধ্যম থেকে দূরে থাকে। ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়েছে।
নির্বাসন, নজরদারি ও ভয়ের ছায়া
অনেক দেশে স্বাধীন সাংবাদিকদের দেশ ছেড়ে কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু দূর থেকেও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। নজরদারি প্রযুক্তি, হ্যাকিং, এমনকি বিদেশে হত্যা চেষ্টার ঘটনা ও ঘটেছে। ফলে তথ্যদাতারা কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন, আর সত্য উদ্ঘাটনের পথ সংকুচিত হচ্ছে।
অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের আলো
বিশ্বব্যাপী প্রবণতা স্পষ্ট—সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল করা মানে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল করা। আজ যারা সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করছে, আগামী দিনে তাদের শাসন আরও অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















