কিম হানা: একা থাকতে থাকতে দশ বছর কেটে গিয়েছিল, হঠাৎ একদিন টের পেলাম এই একাকী জীবনের চাপ ও পরিশ্রম কতটা। বুঝতেই পারিনি, গভীর রাতের ভাবনা আর অকারণ দুশ্চিন্তায় কত শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। মনে প্রশ্ন জাগল—এই ক্লান্তি কি তবে একা থাকার সুবিধাগুলো থেকে আমার সরে যাওয়ার ইঙ্গিত? বিয়ে কোনো সমাধান মনে হয়নি। বরং তা ছিল আরেকটি ক্লান্তিকর জগতে প্রবেশের মতো—যেখানে বিয়ের প্রতিষ্ঠান, শ্বশুরবাড়ি আর পিতৃতন্ত্রের নিয়ম কাজ করে। তাছাড়া, কোনো পুরুষ এসে আমাকে মোহিত করবে—এমন সম্ভাবনাও দেখিনি, আর সেটাও আমি চাইনি।
স্বাভাবিকভাবেই অন্যরকম জীবনের সন্ধান শুরু করলাম। বন্ধুদের সঙ্গে থাকা থেকে শুরু করে যৌথ বাসস্থান—সবকিছু নিয়ে ভাবলাম। শেষ পর্যন্ত এমন এক নারীর সঙ্গে দেখা হলো, যার সঙ্গে আমার আশ্চর্য মিল। আমরা দুজনেই বুসান শহরের, চল্লিশের কোঠায়, বহুদিন ধরে একা থাকছি, স্বামী ছাড়া অন্য ধরনের সঙ্গ খুঁজছি, আর আমাদের প্রত্যেকেরই দুটি করে বিড়াল আছে। মনের কথা ভাগাভাগি করতে গিয়ে জানলাম, সুনউও একা থাকার জীবন ছাড়তে চাইছে এবং নতুন কোনো পথ খুঁজছে। যতই আমরা একে অন্যকে চিনতে থাকলাম, ততই মনে হলো—যদি সেই মানুষটি সেও হয়?

২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর, দুপুর দুইটায়, আমরা দুজন—হোয়াং সুনউ এবং আমি—আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বাড়ির মালিক হলাম। ব্যাংকের সহায়তায় আমরা একসঙ্গে থাকার জন্য একটি প্রশস্ত অ্যাপার্টমেন্ট কিনলাম। আলাদা আলাদা ছোট বাসায় রান্নাঘর, বাথরুম আর বসার জায়গা গুঁজে রাখার বদলে একই সুবিধাসহ দ্বিগুণ বড় একটি বাড়ি ভাগাভাগি করে নেওয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হলো। অতিরিক্ত জায়গার কথা বলাই বাহুল্য। আমাদের বিড়ালগুলো অবশেষে দৌড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা পেল। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা একটি বাথটাব পেলাম—আগে জায়গার অভাবে যার কথা ভাবিইনি, অথচ এখন সেটি থাকা সত্যিই আনন্দের।
দশ বছর আগে সহবাসী হিসেবে সুনউর সঙ্গে থাকতে শুরু করেছি, আর এই ব্যবস্থায় আমি ভীষণ সুখী। কাজের দায়িত্বও সুন্দরভাবে ভাগ হয়ে গেছে। সুনউ রান্না ও গুছিয়ে রাখা সামলায়, কাপড় ধোয়ার মেশিনে দেয়; আর আমি বাসন ধুই, ঘর পরিষ্কার করি এবং ধোয়া কাপড় গুছিয়ে রাখি। বিছানায় শুয়ে বাড়িতে আরেকজন মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মন শান্ত হয়ে যায়। প্রতিটি সকাল আমাদের যৌথ জীবনের ছোট ছোট সংকেতে জেগে ওঠে, আর আমাদের ক্ষুদ্র সম্ভাষণ—ভালো ঘুম হয়েছে? তুমি এসেছ! আমি একটু যাচ্ছি—দৈনন্দিন জীবনে রঙ ছড়িয়ে দেয়।
একা থাকতে হলে নিজের আবেগের উষ্ণতা ধরে রাখতে সচেতন চেষ্টা করতে হতো। কিন্তু সুনউ পাশে থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। আর শরীর গরম করার দরকার হলে বাথটাবে ডুবে থাকার সুযোগ তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা দুজনেই অবিবাহিত। ছুটির সময় আমরা বাবা-মায়ের কাছে যাই বা তাদের খোঁজ নিই। আমাদের একসঙ্গে থাকার বিষয়টি তাদেরও ভালো লাগে; এতে তারা নিশ্চিন্ত বোধ করেন।

হোয়াং সুনউ: এই বয়সে অবিবাহিত থাকার ভালো দিক হলো—আমি এমন একটি গোপন সত্য জানি, যা পৃথিবী জানে না। বিয়ে না করলেও পৃথিবী শেষ হয়ে যায় না। আমি নিজে বিয়ে করিনি বলেই জানি—সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। আমার ভেতরে রয়েছে নানান গল্প ও জটিল ইতিহাস, যা কেবল আমিই জানি; অন্য কারও মুখের অসাবধানী সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় আমাকে বোঝা যায় না। আর কৌতূহলী লোকদের হতাশ করতে হলেও বলছি—আমি এই মুহূর্তে বেশ সুখী।
মানুষের জীবনযাপনের ধরন আইন, প্রতিষ্ঠান বা ধারণার চেয়ে দ্রুত বদলায়। যেমন কর্মীরা আর অবসর পর্যন্ত এক কোম্পানির প্রতি নিজেকে সমর্পণ করে রাখছে না, তেমনি মানুষও রক্তের সম্পর্ক বা বিয়ের প্রচলিত বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন গড় আয়ু শত বছরের দিকে এগোচ্ছে। অবিবাহিত দম্পতি, তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হানা আর আমার মতো আরও অনেকেই বন্ধুত্বে সঙ্গ খুঁজবে।
বিয়ের জীবন সম্পর্কে হারুকি মুরাকামি বলেছেন, “ভালো হলে তা অসাধারণ”—আমার আর হানার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমি জানি না, আর কখনও এমন কাউকে পাব কি না, যে আমার সব বাজে রসিকতায় হাসবে, প্রিয় গান ভাগাভাগি করতে করতে অদ্ভুত নাচের ভঙ্গি বানাবে, আর কঠিন দিনের শেষে বলবে—আমি ভালো মানুষ, আমি ঠিক আছি। এমন আশীর্বাদ কি জীবনে একবারই আসে না?
![]()
ধরা যাক, হানার মতো আর কাউকে পেলামও—তবু তার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, তর্ক-বিতর্ক, আসবাবপত্র এক করা, বাড়তি জিনিস ফেলে দেওয়া, আমার জিনিস না ফেলতে চাওয়া নিয়ে ঝগড়া—এসব পার হওয়ার ধৈর্য থাকবে বলে মনে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আমাদের চারটি বিড়ালকে কীভাবে বোঝাব যে তারা আর তাদের সঙ্গীদের দেখতে পাবে না? তা হতে দিতে পারি না।
একদিন হয়তো এই সবকিছুর শেষ হবে, কিন্তু আমি চাই সেই দিনটি যতটা সম্ভব দূরে সরে থাকুক।
রাধিকা সঙ্ঘানি 



















