আজকের বিশ্বে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক দায়িত্ব সম্ভবত সবচেয়ে কঠিনগুলোর একটি। চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে তাঁর দেশ সম্প্রতি সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সশস্ত্র অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে, যা নিরাপত্তা বাহিনী সহিংসভাবে দমন করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী অন্তত তিন হাজার মানুষ নিহত হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় একটি “বিশাল নৌবহর” পাঠিয়েছে। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র “সম্পূর্ণ প্রস্তুত” অবস্থায় প্রতিক্রিয়া জানাবে। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনও উচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খুলেছে। ২৮ জানুয়ারি ট্রাম্প বলেন, পারমাণবিক চুক্তি করার জন্য ইরানের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এর জবাবে আরাগচি জানান, ইরান একটি ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির জন্য প্রস্তুত, কিন্তু জবরদস্তির জন্য নয়। তিনি আরও বলেন, যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা, বাহ্যিক হামলার আশঙ্কা, কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্বল অর্থনীতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। সর্বাত্মক যুদ্ধ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, কিন্তু ইরান দুর্বলতার কোনো ইঙ্গিতও দিতে চায় না। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো পরিণতি এড়াতে চায় দেশটি। তাই জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করাই এখন আরাগচির প্রধান দায়িত্ব।

৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ওমানের রাজধানী মাসকাটে যান, যেখানে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা হয়। কোনো অগ্রগতি না হলেও আবার বৈঠকে বসার বিষয়ে সম্মতি হয়। যুদ্ধের মেঘ পুরোপুরি কাটেনি, তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার একটি ক্ষুদ্র সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আসন্ন সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমিয়েছে।
১৯৬২ সালে শাহ শাসিত তেহরানে জন্ম নেওয়া আব্বাস আরাগচির বেড়ে ওঠা ইসলামী বিপ্লবের অস্থির সময়ে। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ফারসি, আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল আরাগচি যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণাপত্রে বিশ শতকের ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধারণার বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে আধুনিক ইসলামী চিন্তা ঈশ্বরের সর্বময় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জনগণের সার্বভৌমত্বকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছে এবং পশ্চিমা গণতন্ত্রের উপাদানকে ইসলামী নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
সংস্কারপন্থী সম্ভাবনা
ইরানের পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোর ভেতরে আরাগচির উত্থান দ্রুত ঘটে। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সমাপ্তির বছরে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থায় উপ-রাষ্ট্রদূত করা হয়। ১৯৯৯ সালে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সময় তিনি ফিনল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত হন। পরে জাপানেও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ছিলেন।

তাঁর কর্মজীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০১৩ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তাঁকে আইনি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেন। রুহানি বিশ্ববাসীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এর ফল ছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি, যার অধীনে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয় এবং বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। সে সময় প্রধান আলোচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আরাগচি। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ইরান বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ পায়।
কিন্তু ২০১৮ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তিনি চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ চুক্তি বলে আখ্যা দেন এবং “সর্বোচ্চ চাপ” নীতি গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতে, তখন ইরান চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মেনে চলছিল। আরাগচি বলেন, কূটনীতি সবচেয়ে জটিল বিরোধও সমাধান করতে পারে—কিন্তু সদিচ্ছার জবাব তারা পায়নি।
কঠোরপন্থী প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ক্ষমতায় এলে আরাগচিকে প্রধান পারমাণবিক আলোচকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একাধিক পরোক্ষ আলোচনা হলেও অগ্রগতি হয়নি। ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় রাইসি নিহত হন।

বারো দিনের যুদ্ধ
সংস্কারপন্থী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া মাসউদ পেজেশকিয়ান আরাগচিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার পারমাণবিক আলোচনা শুরু করে। কিন্তু জুনে ইসরায়েলের বোমা হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে সেই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। বারো দিনের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি হলেও ইরান আলোচনা স্থগিত করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়।
কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে সংকট তৈরি হয়—রাস্তায় বিক্ষোভ, ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। মাসকাট বৈঠকের আগেই স্পষ্ট ছিল, আলোচনার ধরন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। আরাগচি বলেন, আলোচনা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিলিশিয়া সমর্থনের বিষয়ও আলোচনায় থাকুক।
এই মতপার্থক্যই আরাগচির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরে। তাঁর গবেষণায় যেমন পশ্চিমা গণতন্ত্র ও ইসলামী নীতির সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, বাস্তব কূটনীতিতে এখন তাঁকে সামরিকভাবে শক্তিশালী ও শত্রুভাবাপন্ন আমেরিকার সর্বোচ্চ দাবির সঙ্গে নিজের দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি এক কঠিন দায়িত্ব।
স্ট্যানলি জনি 



















