হায়দরাবাদের প্রান্তবর্তী আঙুরখামার থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের গভীর ধানক্ষেত—তেলেঙ্গানার কৃষি আজ বহুলাংশে নির্ভর করছে ভিনরাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের ওপর। কৃষক, কৃষক সংগঠনের কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিবাসী শ্রমিকরা এখন কৃষিকাজ পরিচালনায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন।
বিহারের মধেপুরা থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে তেলেঙ্গানায় এসেছিলেন ফুলেন্দর ঠাকুর। এখন তার বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি। বড় ভাইয়ের সূত্র ধরে তিনি মেদচাল মালকাজগিরি জেলার একটি আঙুরখামারে কাজ শুরু করেন। তখন বিস্তীর্ণ জমিতে আঙুরচাষ হতো, শ্রমিকেরও অভাব ছিল না। দ্রুত কাজ শিখে নেন তিনি এবং খামারই হয়ে ওঠে তার পরিচিত জগৎ।
সময়ের সঙ্গে দৃশ্যপট বদলেছে। আঙুরচাষের জমি কমেছে, অনেক চাষি সরে গেছেন। তবু নিজের দক্ষতায় টিকে আছেন ঠাকুর। বর্তমানে মুদুচিন্তলাপল্লির একটি আঙুরখামারে শ্রমিকদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি; সঙ্গে কাজ করছেন তার তিন ভাইও। তার অভিজ্ঞতার খবর পৌঁছে গেছে নিজ গ্রামেও—বিহারের তরুণরা এখন কাজের সন্ধানে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি তেলেঙ্গানাতেই থাকেন, বছরে এক-দুবার বাড়ি যান। ছটপুজোর মতো বড় উৎসবেও বাড়ি যেতে পারেন না, কারণ সে সময় আঙুরের ডাঁটা কাটার কাজ থাকে। তার সঙ্গে থাকা তরুণ শ্রমিকরাও একই গ্রামের, যারা তিন বছর আগে এসে তার কাছেই কাজ শিখেছে।

এই ব্যক্তিগত গল্পটি এখন পুরো রাজ্যে দেখা যাওয়া একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল বলছে, ভিনরাজ্য থেকে কৃষিশ্রমিকের আগমন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ কৃষিভূমিও এই নির্ভরতার একটি কারণ। রাজ্যের মোট ভৌগোলিক এলাকা ২৭৬.৯৫ লক্ষ একরের বেশি, যার ২০২২-২৩ সালে প্রায় ৫২.৬১ শতাংশ ছিল নেট বপনকৃত জমি।
বড় জমির মালিক বা ইজারাদার কৃষকদের জন্য বপন, ছাঁটাই, ফসল তোলা ও পরবর্তী কাজের জন্য স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে বিহার, ওডিশা, ছত্তিশগড়সহ অন্যান্য রাজ্যের শ্রমিকরা। অনেকেই পরিবারসহ খামারে থাকেন; তাদের জন্য বাসস্থান, খাবার ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকে। কাজের ধরন ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে মাসিক মজুরি সাধারণত ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকার মধ্যে। কোথাও আবার ধানভর্তি বস্তা প্রতি ১৬-২৫ টাকা, বেরি তোলায় একরপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বা মরিচ তোলার মতো শ্রমঘন কাজে এককালীন পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
রাঙ্গারেড্ডি জেলার কিসারার একটি পেঁপেখামারে কাজ করা বিহারের দুলকার চাঁদ জানান, মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা মজুরির পাশাপাশি থাকার ও খাবারের সুবিধাও মেলে। পুরুষেরা সার বহন ও জমিতে ছড়ানোর কাজ করেন, নারীরা পাশের কচুরলতা খামারে কাজ করেন। সাধারণত পরিচিতির মাধ্যমেই শ্রমিকরা এসব খামারে কাজের সুযোগ পান।

স্থানীয় তরুণদের আগ্রহ কমছে
কৃষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, বহু বছর ধরেই ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের উপস্থিতি বাড়ছে, একই সঙ্গে কৃষিকাজে স্থানীয় তরুণদের আগ্রহ কমছে। বিকল্প জীবিকার সুযোগ, শিক্ষার প্রসার, নিজস্ব ছোট জমিতে কাজের প্রবণতা এবং অস্থায়ী কাজের প্রতি আকর্ষণ—সব মিলিয়েই এই পরিবর্তন ঘটছে।
সেচব্যবস্থার উন্নতির ফলে চাষের জমি বেড়েছে, ফলে শ্রমিকের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় সেচপ্রকল্পগুলোর কারণে ২০১৪ সালের ১.৩১ কোটি একর থেকে ২০২৩ অর্থবছরে চাষের জমি বেড়ে ২.২১ কোটি একরে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একফসলি চাষ, যান্ত্রিকীকরণ, রাসায়নিকের ব্যবহার ও দ্রুত নগরায়ণ কৃষিশ্রমিকের কর্মদিবস কমিয়ে দিয়েছে। কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের প্রাপ্যতাও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। ফলে অনেকেই অন্য খাতে কাজের পথ খুঁজছেন। স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।
একই সময়ে তুলা ও ধানের মতো ফসল একসঙ্গে কাটার মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা স্পষ্ট হয়। বহু ফসলের চাষ বাড়ালে কৃষকের নিয়মিত আয় ও শ্রমিকের কাজের সুযোগ দুটোই বাড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

ইজারাদার কৃষকের উত্থান
কিছু কৃষিশ্রমিক বড় জমি ইজারা নিয়ে নিজেরাই চাষ শুরু করেছেন। আবার যেসব জমির মালিকদের সন্তান অন্য রাজ্য বা দেশে চলে গেছেন, সেসব জমি ক্রমশ ইজারায় যাচ্ছে। ছোট কৃষকরা সাধারণত পরিবার নিয়ে নিজেরাই জমিতে কাজ করেন, কিন্তু ২০-৩০ একর ইজারা নেওয়া কৃষকের পক্ষে শ্রমিক ছাড়া কাজ চালানো সম্ভব নয়।
কোথাও কোথাও এখনও বিনিময়ভিত্তিক শ্রমপ্রথা আছে—একজন অন্যের জমিতে কাজ করেন, পরে একইভাবে সাহায্য পান।
ছোট জমিতে সবজি চাষের ঝোঁক
মুদুচিন্তলাপল্লির আদ্রাসপল্লি গ্রামের কৃষক ওয়াই. বলাইয়া জানান, এক একর বা তারও কম জমির মালিকরাও এখন চাষাবাদের ওপর নির্ভর করছেন। ধানের বদলে তিনি সবজি চাষ শুরু করেছেন, কারণ এতে বিনিয়োগ কম ও আয় নিয়মিত। বাজারে সরাসরি বিক্রি করায় দালালকে কমিশন দিতে হয় না। শ্রমিক রাখলে লাভ কমে যায়, তাই স্ত্রীসহ নিজেরাই ফসল তোলেন। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়াও কঠিন।

রাজ্যের মোট কৃষিখামারের সংখ্যা প্রায় ৭০.৬০ লক্ষ। এর মধ্যে ৯১.৪ শতাংশই দুই একরের কম জমির ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, যারা মোট চাষযোগ্য জমির বড় অংশ পরিচালনা করেন।
দক্ষ শ্রমের নতুন চলাচল
অন্যদিকে বহু অভিজ্ঞ কৃষিশ্রমিক বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি অন্য রাজ্যেও কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন। কেউ লতা-মাচা তৈরিতে দক্ষ, কেউ ফলগাছ ছাঁটাই বা কলম করার কাজে পারদর্শী। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ায় এসব দক্ষ দলের কাজের সুযোগও বেড়েছে। বছরের ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ফলগাছ ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হওয়ায় তারা প্রায় সারা বছরই কাজ পান।
তবে দক্ষতা ও চাহিদা বাড়লেও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। ভূমিহীন ও অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বীমা বা সুরক্ষাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু হলে সহকর্মীরাই চাঁদা তুলে মরদেহ নিজ রাজ্যে পাঠান—এমন বাস্তবতাই এখনও বিরাজমান।
কে. শিবা শঙ্কর 



















