অন্ধ্রপ্রদেশে চলমান মানুষ–প্রাণী সংঘাত বহু মানুষের জীবিকা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। পূর্ব গোদাবরী ও এলুরু জেলায় একটি অল্পবয়সী পুরুষ বাঘ ২০টি গবাদিপশু হত্যা করায় তামাকচাষি, দুগ্ধচাষি ও কৃষিশ্রমিকদের জীবনযাত্রা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গ্রামে বন্যের আগমন
এলুরু জেলার কোয়্যালাগুডেম মণ্ডলের দিপ্পাকায়ালাপাডু গ্রাম কান্নাপুরম বনাঞ্চলের সন্নিকটে অবস্থিত। চারদিকে বিস্তৃত তামাকক্ষেত এই ছোট্ট গ্রামটির প্রধান পরিচয়। জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি সাধারণত ফসল কাটার মৌসুম, যখন স্থানীয় কৃষকেরা গুন্টুর, প্রকাশম, এমনকি মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানা থেকেও শ্রমিক এনে তামাকপাতা শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন।
কিন্তু জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে হঠাৎ ক্ষেতগুলো নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। অল্প কয়েকজন শ্রমিক আতঙ্কিত মুখে কাজ করছিলেন। কারণ, এলাকায় একটি বাঘ দেখা গিয়েছিল। চার বছর বয়সী এই পুরুষ বাঘটি ২২ জানুয়ারি থেকে গবাদিপশু হত্যা শুরু করে।
তাডোবা–আন্ধারি টাইগার রিজার্ভের এই বাঘকে প্রথম অন্ধ্রপ্রদেশে দেখা যায় এলুরু জেলার পাণ্ডিরিমামিডিগুডেমের কাছে। ২৬ জানুয়ারির ভোরে এটি বিল্লিমিল্লি গ্রামের একটি মহিষ মেরে ফেলে। দুই ঘণ্টা পর কাছাকাছি দিপ্পাকায়ালাপাডু গ্রামে আরেক কৃষকের দুটি গরুর ওপর আক্রমণ করে, একটি মেরে ফেলে ও অন্যটিকে আহত করে। পরপর এই ঘটনায় গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বনকর্তারাও বাঘটির অস্বাভাবিক আচরণে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
এলুরু জেলার বনাধিকারিক পি. ভি. সন্দীপ রেড্ডি জানান, গত দুই সপ্তাহে বাঘটি প্রায় প্রতি রাতে গড়ে দুটি করে গবাদিপশু মেরেছে—এলুরুতে ১৪টি এবং পূর্ব গোদাবরীতে ছয়টি। এই ধারাবাহিক ক্ষতি দুগ্ধচাষিদের জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাঘটিকে রাজামহেন্দ্রবরম শহরের উপকণ্ঠে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর এটি আরেকটি পুরুষ বাঘের সঙ্গে নিজ আবাস ত্যাগ করেছিল। বর্তমানে প্রায় ১০০ বনকর্মী এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ এটিকে অবশ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটি কমিটি গঠন করেছে।
চূর্ণবিচূর্ণ তামাক মৌসুম
কোয়্যালাগুডেম ও বুট্টায়াগুডেমের তামাকসমৃদ্ধ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া ভয় তামাকচাষি ও কৃষিশ্রমিকদের জীবিকা থামিয়ে দেয়। একাধিক দিন শ্রমিক না আসায় ফসল কাটতে দেরি হয়, ফলে পাতার গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একজন কৃষক জানান, তামাক গাছে সাধারণত ২০টি পাতা থাকে, কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় এবার মাত্র ১৮টি হয়েছে এবং দেরির কারণে কয়েকটি পাতা অতিরিক্ত পেকে গেছে। প্রতিটি পাতা পেকে যাওয়া মানে আর্থিক ক্ষতি। গত বছর নিম্নমানের তামাকের দাম ছিল কেজি প্রতি প্রায় ১২০ টাকা, আর উচ্চমানের তামাক বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকায়।
তবুও অনেক শ্রমিক জীবিকার তাগিদে কাজে এসেছেন। এক আদিবাসী নারী প্রতিদিন ১৫ কিলোমিটার দূরের বনাঞ্চল থেকে এসে আগাছা পরিষ্কার করেন, কারণ ৩০০ টাকার দৈনিক মজুরি হারানোর সুযোগ তাঁর নেই।
জেলা কৃষি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এলুরু জেলায় ৮,৭৫০ জন কৃষক এফসিভি তামাক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ১১০ জন কৃষক প্রতিটি বার্নে ১০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা
ঘটনার পর গ্রামবাসীরা কয়েক রাত টর্চ ও লাঠি নিয়ে পাহারা দিয়েছেন। বনবিভাগ গবাদিপশু বাড়ির কাছে রাখার পরামর্শ দিলেও প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে চরানো কঠিন বলে কৃষকেরা জানান।
কোয়া জনগোষ্ঠীর একটি ছোট গ্রামে বহু মানুষ কেবল কৃষিশ্রম বা দুগ্ধচাষের ওপর নির্ভরশীল। দুধ বিক্রি করে লিটারপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা পেলেও বাঘের আক্রমণে সেই আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বনকর্তারা জানান, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এখনো নির্ধারিত না হলেও মোট প্রায় চার লাখ টাকা হতে পারে।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ–মানুষের মুখোমুখি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় বাঘের সংখ্যা বাড়ায় তারা নতুন এলাকা খুঁজছে। ২০২২ সালের গণনায় অন্ধ্রপ্রদেশে ৬৩টি বাঘ রয়েছে।
সাধারণত বাঘ মানুষের ওপর আক্রমণ করে না; বন্যপ্রাণীর আক্রমণের তালিকায় স্লথ ভালুক, হাতি ও চিতাবাঘের পর বাঘের অবস্থান। তবে এই বাঘটি বারবার গবাদিপশু শিকার করে ভিন্ন আচরণ দেখিয়েছে।
বনকর্তারা মনে করছেন, শারীরিক দুর্বলতা নয়, বরং সহজ শিকার হিসেবে গবাদিপশু হত্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এটি। পাপিকোন্ডা জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার পরও দুই দিনের মধ্যে ফিরে আসা তারই ইঙ্গিত।
ভারতের বিচরণরত বাঘ নিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, নতুন আবাস, খাদ্য ও সঙ্গীর সন্ধানেই বাঘেরা স্থান পরিবর্তন করে। নিজ বনাঞ্চল ভরে গেলে অন্যত্র যাওয়াই তাদের টিকে থাকার উপায়।

বিচিত্র গতিবিধি ও সংরক্ষণ ভাবনা
প্রথমে বাঘটি নিজের এলাকা চিহ্নিত না করায় অস্থায়ী বিচরণ মনে করা হলেও পরে গাছে আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে তাডোবা–আন্ধারি থেকে পাপিকোন্ডা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কিলোমিটার এলাকা বাঘের চলাচলের কার্যকর করিডর হয়ে উঠেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
পাপিকোন্ডায় বাঘের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না থাকলেও ২০১৬ সালে তিনটি বাঘের উপস্থিতি রেকর্ড হয়। এলাকাটির একটি অংশ পোলাভারাম সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে, যা আবাসভূমি ভাঙনের আশঙ্কা বাড়ায়।
বনকর্তারা মনে করছেন, জাতীয় উদ্যানটিকে টাইগার রিজার্ভ ঘোষণা করলে সংরক্ষণ জোরদার করা সম্ভব হবে। তবে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দুগ্ধচাষিদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া, যাতে প্রতিশোধমূলক হত্যার ঝুঁকি না বাড়ে।
নেল্লোর শ্রাবণী 



















