হংকংয়ের নিউ টেরিটরিজের একটি পুকুরে ৮৫ কেজি ওজনের পরিত্যক্ত অ্যালিগেটর স্ন্যাপিং কচ্ছপ মাছ খেতে দেখা যাওয়ার পর প্রাণী অধিকারকর্মীরা প্রাণীকল্যাণ আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনুমোদিত পোষা প্রাণীর তালিকা তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
কর্মীদের দাবি, সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি হওয়া কচ্ছপে মাইক্রোচিপ বসানো, পোষা প্রাণী বনে ছেড়ে দিলে শাস্তি বাড়ানো এবং ‘পোষা-বান্ধব’ সমাজ গড়ার আগে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ হালনাগাদ করা জরুরি।
কচ্ছপ উদ্ধারের ঘটনা
টার্টলস ইন নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বন চ্যান চুং-পং জানান, ১৩ জানুয়ারি ইউয়েন লংয়ের তাই সাং ওয়াই এলাকায় কৃষি, মৎস্য ও সংরক্ষণ বিভাগ একটি বড় অ্যালিগেটর স্ন্যাপিং কচ্ছপ আটক করে। এর আগে কৃষকেরা পুকুরে মাছ কমে যাওয়ার রহস্যময় ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন, কিছু মাছকে অর্ধেক কামড়ে খাওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।
পুকুরের পানি নিষ্কাশনের সময় প্রায় এক মিটার লম্বা কচ্ছপটি ধরা পড়ে। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খবর দেন। দীর্ঘ তিন দশক ধরে কচ্ছপ নিয়ে কাজ করা চ্যান আলোচনার মাধ্যমে কচ্ছপটিকে হত্যা না করে নিজের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে ‘ইয়োশি’ নামের কচ্ছপটি সাই কুংয়ের কমিউনিটি শিক্ষা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
পরিবেশের জন্য বড় হুমকি
উত্তর আমেরিকার এই প্রজাতির কচ্ছপ শীর্ষ শিকারি এবং প্রায় সম্পূর্ণ মাংসাশী। মানুষের বাইরে এদের স্বাভাবিক কোনো শিকারি নেই। ফলে এ ধরনের প্রাণী স্থানীয় পরিবেশে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চ্যান।
তিনি বলেন, স্ন্যাপিং কচ্ছপ, বড় আকারের টিকটিকি বা শিকারি মাছ শহুরে জীবনের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তার সংগঠন প্রতি মাসেই পরিত্যক্ত কচ্ছপের খবর পায় এবং ধরা পড়া কচ্ছপগুলোর আকারও ক্রমে বড় হচ্ছে।
চ্যানের ভাষ্য, কম দামে বিক্রি হওয়া এবং খুব কম যত্নেও বেঁচে থাকার ক্ষমতার কারণে কচ্ছপ সবচেয়ে সহজে অবহেলিত পোষা প্রাণীতে পরিণত হয়।

আইন ও আমদানির তথ্য
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি অনুপযুক্ত আচরণের শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং দুই লাখ হংকং ডলার জরিমানা।
বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত কনভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হংকংয়ে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৯টি অ্যালিগেটর স্ন্যাপিং কচ্ছপ আমদানি হয়েছে, যা শহরটিকে এ প্রজাতির অন্যতম বড় আমদানিকারকে পরিণত করেছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আমান্ডা হুইটফোর্ড বলেন, এসব কচ্ছপের অনেকই শেষ পর্যন্ত হংকংয়ের ঘরে পৌঁছায় না। বরং অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে মূল ভূখণ্ড চীনে পাচার হয়ে প্রজনন খামারে পাঠানো হয়, যেখানে এগুলো পোষা প্রাণী, খাদ্য বা ঐতিহ্যবাহী ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আইন সংস্কারের দাবি
২০২১ সালে বেইজিং আক্রমণাত্মক প্রজাতির ঝুঁকি মোকাবিলায় জীবসুরক্ষা আইন জোরদার করে। হুইটফোর্ডের মতে, হংকংয়েরও একই পথ অনুসরণ করা উচিত এবং কেবল কুকুর-বিড়াল নয়, সরীসৃপের ক্ষেত্রেও মাইক্রোচিপ বাধ্যতামূলক করা দরকার।
তার বক্তব্য, প্রাণীগুলোর সঠিক অনুসরণযোগ্যতা এখনও নেই, ফলে সহজেই অবৈধভাবে ব্যবস্থার ভেতর ঢুকে পড়তে পারে। গত দুই দশক ধরে সমাধানহীন এসব সমস্যা প্রাণী সুরক্ষায় সরকারের সক্ষমতা নিয়ে জনআস্থাকে দুর্বল করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি প্রতিক্রিয়া
২০১৯ সালে প্রাণীকল্যাণ আইন সংশোধনের জন্য জনপরামর্শ শুরু হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। সংরক্ষণ বিভাগ জানিয়েছে, কিছু প্রস্তাব নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে মতভেদ থাকায় আবারও পরামর্শ নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে ‘যত্নের দায়বদ্ধতা’ চালু করা এবং প্রাণী নির্যাতনের শাস্তির মাত্রা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
বিভাগটি জানায়, মতামত সংগ্রহ শেষে সংশোধনী আইন পরিষদে উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে প্রাণীকল্যাণ উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তারা বাসিন্দাদের পোষা প্রাণী নেওয়ার আগে ভালোভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















