মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি জার্মান অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান রপ্তানি তীব্রভাবে কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে, যা ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পতনের চিত্র
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান রপ্তানি প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৪৭ বিলিয়ন ইউরোতে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জার্মানিতে আমদানি সামান্য বেড়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে ৫২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে আসে, যা ২০২১ সালের পর সর্বনিম্ন। আগের বছর এই উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৭০ বিলিয়ন ইউরো।
শুল্কের প্রভাব ও প্রতিযোগিতায় চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মার্কিন শুল্ক জার্মান পণ্যের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিয়েছে। জুলাই মাসে হওয়া চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ ভিত্তি শুল্ক আরোপ হয়, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। জার্মানির গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক খাত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে জার্মান গাড়ি ও যন্ত্রাংশ রপ্তানি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে, যন্ত্রপাতি রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ এবং রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি।
চীন ও ইউরোপে বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য কিছুটা বাড়ায় মোট রপ্তানিতে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। অন্যদিকে চীনে জার্মান রপ্তানি কমেছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে দেশীয় প্রতিযোগিতা ও দুর্বল চাহিদা বড় কারণ। তবে চীন থেকে জার্মানিতে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ, কারণ উচ্চ মার্কিন শুল্ক এড়াতে চীনা পণ্য ইউরোপমুখী হচ্ছে। ফলে আবারও চীন জার্মানির বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে।
সামগ্রিক বাণিজ্য ও শিল্পের অবস্থা
২০২৫ সালে জার্মানির মোট বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে দাঁড়ায় ২০০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরোতে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ইউরো কম। একই সময়ে ডিসেম্বরে কারখানা উৎপাদন মাসওয়ারি হিসাবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, যদিও অর্থনীতিবিদরা এটিকে সাময়িক বিরতি বলেই মনে করছেন। তাদের মতে, জার্মান শিল্প খাত একটি নতুন চক্রাকার পুনরুদ্ধারের শুরুতে রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও সরকারের বার্তা
দীর্ঘ মন্দাভাবের পর চলতি বছরে জার্মান অর্থনীতি প্রায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে বলে সরকারের আশা। শিল্প আদেশ ও ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক তথ্যে ও কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। সংস্কার ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছাতে এখনও সময় লাগবে, তবে দেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
মুদ্রাবাজার ও বন্ড পরিস্থিতি
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পর জার্মান সরকারি বন্ডের ফলন প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার নিয়ে দুর্বল সংকেত পাওয়ায় সেখানকার বন্ড ফলনেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। নীতিনির্ধারকদের মতে, ইউরোর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হলে ভবিষ্যতে মুদ্রানীতিতে প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















