পূর্ব এশিয়ায় বিপুল কিন্তু অপ্রয়োগিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, যা পরিষ্কার জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করে প্রতিযোগিতা বাড়াতে, লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এক নতুন প্রতিবেদনে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথনকশা তুলে ধরা হয়েছে।
কয়লার ওপর নির্ভরতা থেকে নতুন বাস্তবতা
গত কয়েক দশকে পূর্ব এশিয়ার শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল কয়লা। এটি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করলেও অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত করেছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা বদলে গেছে। গ্রিন হরাইজন: ইস্ট এশিয়ার টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অঞ্চলের বিশাল নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে, সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ গড়ে তুলতে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত ক্লিন এনার্জি মিনিস্টেরিয়াল বৈঠকে প্রকাশিত হয়। এতে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের কার্বনমুক্তির বাস্তবসম্মত উপায় তুলে ধরা হয়েছে, যা মিলিয়ে অঞ্চলের মোট নিঃসরণের প্রায় ৭৫ থেকে ৮৭ শতাংশের জন্য দায়ী। কৌশলগত চারটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে—জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুতায়ন ত্বরান্বিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং সবুজ হাইড্রোজেন ও কার্বন ধারণ-ব্যবহার-সংরক্ষণ প্রযুক্তির প্রয়োগ।
চ্যালেঞ্জের পরিমাণ ও সম্ভাবনার বিস্তার
চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই চার অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী কয়লা ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ৪০ শতাংশের বেশি উৎপন্ন করে, যা সম্মিলিতভাবে সব উন্নত অর্থনীতির নিঃসরণের চেয়েও বেশি। বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়া এবং কয়লার ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকার ফলে নিঃসরণ বেড়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী তিন দশকে অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে, যা জলবায়ু লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সম্ভাবনাও বিশাল। এই চার দেশে মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনা রয়েছে, যার ৯৭ শতাংশ এখনো ব্যবহার হয়নি। জলবিদ্যুৎ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সৌর ও বায়ু শক্তির প্রসার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক বায়ু শক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের যৌথ সমুদ্রবায়ু সম্ভাবনা ৭৭০ গিগাওয়াটের বেশি, যা বাড়তি চাহিদা পূরণ ও আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়ক।
বিনিয়োগ, নীতি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্ব
এই চার দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কার্বনমুক্ত করতে আগামী দুই দশকে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকি কমাতে সরকারি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি বিনিয়োগ। এতে আর্থিক বাজারের বিকাশের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিবেদনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় নীতিগত পরিবেশ গড়ে তোলা, সমন্বিত বিদ্যুৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থায়ন কাঠামো তৈরি। একই সঙ্গে কার্বন বাজার অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। চীনে ইতিমধ্যে পরিষ্কার জ্বালানি খাতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করছে, যা বিশ্ব মোটের অর্ধেকেরও বেশি। ভিয়েতনামে ২০৪০ সালের মধ্যে সৌর ও সমুদ্রবায়ু সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনেও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন, নির্মাণ ও জ্বালানি সেবায় কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী জ্বালানি
বিশ্বব্যাপী সরবরাহশৃঙ্খলে কম কার্বন উৎপাদনের চাহিদা বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি পূর্ব এশিয়ার শিল্প প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করতে এবং দ্রুত বর্ধনশীল পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি বাজারে অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ বিল, উন্নত বায়ুমান ও ভালো স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে।
একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাও জোরদার হয়। বৈচিত্র্যময় নবায়নযোগ্য উৎস, বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং নমনীয় উৎপাদন ব্যবস্থা আমদানি নির্ভরতা কমায় ও বৈশ্বিক দামের ধাক্কা সামাল দিতে সাহায্য করে। পরিবহন ও শিল্পের বিদ্যুতায়ন দক্ষতা বাড়িয়ে সামগ্রিক ব্যয় কমাতে পারে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা
এককভাবে কোনো দেশ জ্বালানি রূপান্তর সম্পূর্ণ করতে পারবে না। আসিয়ান অঞ্চলে সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও সংযোগ বাড়ালে ব্যয় কমবে, নিরাপত্তা বাড়বে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত হবে। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড উদ্যোগ এই লক্ষ্যেই কাজ করছে—ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে।
উচ্চাভিলাষ থেকে বাস্তবায়নের পথে
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ পূর্ব এশিয়ায় টেকসই জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়নে সহায়তা দিচ্ছে। ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ২ কোটি মানুষের কাছে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এবং ২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট পরিষ্কার জ্বালানি উন্নয়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সঞ্চালন ও সংযোগ বাড়াতে নতুন অর্থায়ন উদ্যোগ চালু হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বাস্তবায়ন। শত শত প্রকল্প নির্মাণপর্যায়ে নেওয়া, গ্রিড উন্নয়ন সমন্বয় করা, বিদ্যুৎ সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন দেশের নীতিগত কাঠামো সামঞ্জস্য করা দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ও কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য রূপান্তর সহায়তা ও জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সামাজিক দিকটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে এই পরিবর্তনের সুফল সবার কাছে পৌঁছে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















