বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাস্কর্য তৈরি করছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১২৭ কিলোমিটার দূরের গোপালগঞ্জ-৩ আসনের ভোটার তিনি। এই আসন থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা আটবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই হাসিনার আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে আসছিলেন চন্দ্র।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। ২০২৫ সালের ১০ মে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
২০১০ সালে হাসিনার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে ২০২৪ সালের আন্দোলন সংশ্লিষ্ট গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার করছে। একই ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়।
এর আগে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে আলী আহসান মুজাহিদ এবং ২০১৬ সালে দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
একসময় বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ও নিন্দিত এই দলটি এখন দেশের মূলধারার বিরোধী শক্তির সঙ্গে সমানে টক্কর দিচ্ছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে দুর্নীতিতে হতাশ ভোটারদের একটি অংশ অপ্রত্যাশিত বিকল্প হিসেবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে।
বর্তমান সরকার জানিয়েছে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশ নিচ্ছে না। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে।
ভোট দেবেন কি না জানতে চাইলে রমেশ চন্দ্র বলেন, অবশ্যই ভোট দেবেন এবং এবার তিনি জামায়াতকে ভোট দিতে চান। তাঁর দাবি, অন্য সবাই সুযোগ পেয়েছে, এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, জামায়াত নেতারা দুর্নীতি বা চাঁদাবাজিতে জড়িত নন।
চন্দ্রের মতো আরও অনেক ভোটার এখন জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজনৈতিক শক্তির উত্থান
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি জরিপে দেখা যায়, বিএনপি পেয়েছে ৩০ শতাংশ সমর্থন, জামায়াত ২৬ শতাংশ এবং ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি পেয়েছে ৬ শতাংশ।
জানুয়ারির মাঝামাঝি আরেক যৌথ জরিপে বিএনপি ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ, জামায়াত ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং এনসিপি ৭ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে জনঅসন্তোষ বাড়ায় জামায়াত বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে গেছে। দলটি নিজেকে শৃঙ্খলাপূর্ণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ পর্যবেক্ষণসহ নানা ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে।
তরুণ ভোটারদের মধ্যেও দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে চার কোটি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থী ছাত্র সংগঠনের বড় জয় এ প্রবণতা আরও স্পষ্ট করেছে।
আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে, যেখানে ছাত্রনেতৃত্বাধীন দলও রয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতজোট প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতায় যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, জনগণ ম্যান্ডেট দিলে তারা সরকার চালাতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, গত অর্ধশতকে দলটি দক্ষ ও সৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলেছে।
দলের এক প্রার্থী বলেন, তিনি একাই দশটি মন্ত্রণালয় চালাতে সক্ষম।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশ্লেষকের মতে, বিএনপি সরকারের অংশীদার হলেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা জামায়াতের সীমিত। অন্যদিকে আরেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভিজ্ঞতার চেয়ে সততা ও যোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সে দিক থেকে জামায়াত এগিয়ে।
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারীর হারও তুলনামূলক বেশি।

মূল বিতর্ক
দলটির লক্ষ্য ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন বলে জানান আমির। তাঁর দাবি, সংবিধানে বর্ণিত সমঅধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই।
নারীর অধিকার বা শরিয়াহ আইন নিয়ে ভীতির প্রচারণা অমূলক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে বহুত্ববাদী সমাজ নির্মাণই তাদের লক্ষ্য।
অতীত থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী
১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ হলেও পরে রাজনীতিতে ফিরে আসে। অতীতে নির্বাচনী ফলাফল সীমিত ছিল এবং একসময় দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়।
বর্তমান সমর্থন বৃদ্ধির পেছনে গণঅভ্যুত্থানের পর জনসম্মুখে আসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং অতীত নির্যাতনের সহানুভূতি কাজ করেছে বলে দলটির দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও জামায়াতের পক্ষে গেছে।
দলটি চাঁদাবাজি রোধে মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।
একই সঙ্গে ত্রাণ, আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে।
গোপালগঞ্জের রমেশ চন্দ্রের মতো অনেক ভোটার এবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে প্রস্তুত। তবে জরিপের সমর্থন বাস্তব আসনে রূপ নেবে কি না, জোট রাজনীতি সামলানো এবং ১৭ কোটি মানুষের বৈচিত্র্যময় দেশ পরিচালনা—এসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে। মাত্র দেড় বছর আগেও যেখানে জামায়াত টিকে থাকার লড়াই করছিল, এখন দেশ পরিচালনার সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে—যা দেশের ইতিহাসে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
* লেখক একজন বাংলাদেশি অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তাঁর লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মারুফ হাসান 





















