নির্বাচনী পরিবেশে পুরোনো প্রভাবের ধারাবাহিকতা এখনো অটুট। টাকা, ধর্ম, পেশিশক্তি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্য মিলেই নির্বাচনকে ঘিরে অস্বাস্থ্যকর বাস্তবতা তৈরি করছে বলে পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অদূরদর্শী পদক্ষেপ গণভোটকে ঘিরে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
প্রাথমিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের ইঙ্গিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পুরোনো ধারায় ফিরে গেছে। দলীয় সংঘাত, জোটের বিরোধ, অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সহিংসতার প্রবণতা ক্রমেই বেড়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি ও গণভোট নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সংস্থাটি এসব কথা জানায়।
নির্বাচনী সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা
সংস্থাটির মতে, নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা ও পতিত স্বৈরশক্তির কর্মকাণ্ড সামগ্রিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত সময়সূচির মাত্র এক দিনের মধ্যে সম্ভাব্য এক প্রার্থী নিহত হওয়া, দেশজুড়ে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে নারীরা উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন।

অতিরিক্ত ব্যয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
নির্ধারিত সময়ের আগেই দেয়াললেখা, পোস্টার ও প্রচারণা চালিয়ে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে প্রায় সব প্রার্থীর বিরুদ্ধে। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। ভোটার প্রভাবিত করতে অর্থ বিতরণের অভিযোগও সামনে এসেছে। সম্প্রচারমাধ্যমে একক দলের আধিপত্য স্পষ্ট হলেও গণভোটের প্রচার তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
সংঘর্ষের হার অঞ্চলভেদে ভিন্ন
কিছু অঞ্চলে সংঘর্ষের মাত্রা বেড়েছে, বিশেষ করে বরিশাল বিভাগে সহিংসতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী ও ঢাকায় কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রয়ে গেছে। সিলেটে সংঘর্ষ তুলনামূলক কম দেখা গেছে।

গণভোট ঘিরে বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন
গণভোটের অধ্যাদেশ প্রণয়ন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। সময়সূচি ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা দেওয়া আইনগত ও নীতিগত প্রশ্ন তুলেছে। উভয় পক্ষের পদক্ষেপে স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সমঅধিকার ও নিরাপদ অংশগ্রহণের চ্যালেঞ্জ
ধর্মীয় উপাদানের অপব্যবহার এবং অতিরিক্ত ব্যয় নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণসহ সমঅধিকারের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, ভিন্ন পরিচয়ের নাগরিক ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের উদ্যোগও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

নির্বাচনকে অর্থবহ করার আহ্বান
অতীত অভিজ্ঞতায় মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে উল্লেখ করে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভয়ভীতি ছাড়া সব ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
গণভোটে অবস্থান
সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং সবার সমঅধিকারের প্রশ্নে জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















