নির্বাচনের আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি থেকে সরকারের সরে আসা এবং টানা কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা এলেও এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দরে আটকে লাখো টন পণ্য
চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ১৮৫টি জাহাজ ও ২১টি ডিপোতে প্রায় ৬০ লাখ টন পণ্য আটকে আছে। এর মধ্যে খেজুর, ফলমূল, চিনি, তেল, গম, ডালসহ রমজান সংশ্লিষ্ট ভোগ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে। কর্মবিরতির আগে জেটিতে আমদানি পণ্যবোঝাই প্রায় ৩৭ হাজার কনটেইনার জমে ছিল। একই সময়ে ডিপোতে রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ১২ হাজারের বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান ও নির্বাচন কাছাকাছি হওয়ায় মাসের শুরুতেই এসব পণ্য খালাস করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গত ১০ দিনের মধ্যে সাত দিন কর্মবিরতি থাকায় পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

স্বাভাবিক হতে লাগবে অন্তত ১৫ দিন
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, কর্মবিরতি প্রত্যাহার হলেও জাহাজ ও পণ্যের জট কাটাতে কমপক্ষে ১৫ দিন সময় লাগবে। ফলে জাহাজে থাকা অনেক ভোগ্যপণ্য সময়মতো রমজানের বাজারে পৌঁছাবে না। এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি এবং যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধের আশঙ্কায় রপ্তানিকারকরাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
শিল্পমালিকদের উদ্বেগ
পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, আটকে থাকা জাহাজগুলোর অনেকগুলোতেই শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে। আবার ডিপোতে বিপুল পরিমাণ রপ্তানি কনটেইনার জমে আছে। দূরদর্শিতার অভাবে সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হওয়ায় দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বহির্নোঙরেও অচলাবস্থা
কর্মবিরতির প্রভাবে বহির্নোঙরের জাহাজ থেকেও পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যায়। আগের দিন যেখানে এক দিনে ৮৪ হাজার টনের বেশি পণ্য খালাস হয়েছিল, সেখানে কর্মবিরতির দিনে কার্যত কিছুই খালাস হয়নি। এতে শিল্পমালিক, শিপিং এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। এখনও বিপুল পরিমাণ খালাসযোগ্য পণ্য জাহাজে আটকে রয়েছে।

কনটেইনার জট ও ডিপোর চাপ
বন্দরের জেটিতে আমদানি কনটেইনারের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে প্রায় ৩৭ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হলেও কর্মবিরতির প্রথম ছয় দিনে ডেলিভারি হয়েছে গড়ে দেড় হাজারেরও কম। দুদিনে একটিও কনটেইনার ছাড় হয়নি।
অন্যদিকে ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার একসময় ১৪ হাজার ছাড়িয়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগবে বলে জানিয়েছেন ডিপো সংশ্লিষ্টরা।
জাহাজের সংখ্যা দ্বিগুণ
কর্মবিরতির আগে অপেক্ষমাণ জাহাজ ছিল ৯৭টি। তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫টিতে। এর অর্ধেকের বেশি জাহাজে রয়েছে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও ছোলাসহ খাদ্যপণ্য। আমদানিকারকদের আশা ছিল রমজানের আগেই এসব বাজারে আসবে, কিন্তু টানা কর্মবিরতিতে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
ধর্মঘট স্থগিত, তবু শঙ্কা
নৌ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে ধর্মঘট সাময়িক স্থগিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে ইতোমধ্যে সৃষ্ট জট খুলতে অন্তত ১৫ দিন সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা। এর মধ্যে নতুন জাহাজ এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

সাত দিনে ক্ষতি ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, গত সাত দিনে বিভিন্ন খাতে সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি পণ্য আটকে আছে। প্রয়োজনে এসব পণ্য আকাশপথে পাঠাতে হলে ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়বে।
শিপিং খাতে প্রতিটি বড় জাহাজকে প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি গুনতে হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে, কমেছে শত শত কোটি টাকা। ডিপো মালিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বার্থ অপারেটর, পরিবহন খাতসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় সব ক্ষেত্রেই আর্থিক ক্ষতি বেড়েছে।
রমজানের আগে অর্থনীতিতে ধাক্কা
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ কর্মবিরতির প্রভাব শুধু বন্দরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ধাক্কা পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। রমজানের আগে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বাজারেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















