০৮:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমদ খানের পদত্যাগ ঘোষণা, নির্বাচনের আগে নতুন আলোচনা ধানের শীষে ভোটের ঘোষণা ওমর সানীর, নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চট্টগ্রামে আবুল খায়ের গ্রুপের কারখানায় বিস্ফোরণ, আহত ১১ অর্থপাচারের পথ শনাক্ত, অর্থ ফেরত এখনো কঠিন দীর্ঘ লড়াই নির্বাচনী ছুটির আগে ফাঁকা ঢাকা, দূরপাল্লায় ঈদের মতো বাড়তি ভাড়া নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং শঙ্কা নেই, ভূমিধস জয়ের আশায় বিএনপি ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্তে স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যয়ের ইঙ্গিত, উচ্চ দামে আটকে তেলের বাজার ইরানে বিক্ষোভ-পরবর্তী দমনযজ্ঞ, গ্রেপ্তার চিকিৎসক – বন্ধ ব্যবসা—ভয় আর নীরবতায় আবদ্ধ সমাজ আফ্রিকায় পুরোনো রোগের পুনরুত্থানের শঙ্কা, সহায়তা কমায় বাড়ছে অন্ধত্বের ঝুঁকি রাশিয়ায় ভারতীয় শ্রমিকের চাহিদা বাড়াল ইউক্রেন যুদ্ধ, বছরে যাচ্ছে চল্লিশ হাজার

উত্তর আটলান্টিকে নতুন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে ফারো দ্বীপপুঞ্জ

উত্তর আটলান্টিকের মাঝখানে অবস্থিত ডেনমার্কের অধীনস্থ ফারো দ্বীপপুঞ্জ সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, জনসংখ্যা কম হলেও এই দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব “অসমানুপাতিকভাবে বড়”।

স্বাধীনতার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা
দশকের পর দশক ধরে ফারোর বহু মানুষ ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে আসছেন। স্থানীয় ভেড়া খামারি ইয়োয়ানেস পাটুরসন বলেন, সংগ্রাম সবসময় থাকবে, কারণ তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মনে করেন।
১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার পক্ষে অল্প ব্যবধানে গণভোটে সমর্থন মিললেও ডেনমার্কের রাজা তা আটকে দেন। পরে ২০০০ সালে পূর্ণ সার্বভৌমত্বের আলোচনা শুরু হলে ডেনমার্ক ভর্তুকি প্রত্যাহারের হুমকি দেয়, ফলে তখনকার দুর্বল অর্থনীতির কারণে দ্বীপপুঞ্জ পিছু হটে।

অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার বাস্তবতা
গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ফারোর স্থানীয় অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী। স্যামন মাছ রপ্তানি থেকে বিপুল আয়, উন্নত টানেল নেটওয়ার্ক, এমনকি সমুদ্রের নিচে নির্মিত গোলচত্বর—সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার মান উচ্চ।
প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জে রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী গাঁজন করা মাটন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় মাছ ধরার নৌবহর, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও রুশ সাবমেরিন নিয়মিত এই জলপথ ব্যবহার করে।

গ্রিনল্যান্ড সংকটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি পুরো ডেনিশ রাজত্বে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এতে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের আরও কাছে সরে আসে এবং ফারো দ্বীপপুঞ্জও অধিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত রাখে।
তবে দ্বীপপুঞ্জের নেতারা স্বাধীনতার স্বপ্ন ত্যাগ করেননি। প্রধানমন্ত্রী অ্যাক্সেল ভি. ইয়োহানেসেন বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক বদলানো জরুরি—এ বিষয়ে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে।

কৌশলগত জলপথের কেন্দ্রে অবস্থান
ফারো দ্বীপপুঞ্জ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চোকপয়েন্ট জিআইইউকে গ্যাপের মধ্যে অবস্থিত, যা গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী জলপথ। এটি রাশিয়ার আর্কটিক থেকে আটলান্টিকে যাওয়ার প্রধান রুটগুলোর একটি এবং ন্যাটো এখানে টহল জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞ ট্রয় জে. বুফার্ডের মতে, জনসংখ্যা কম হলেও দ্বীপগুলো প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ চলাচল পথের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে।

চীন, রাশিয়া ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
২০১৯ সালে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ফারোর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় অংশ নিতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় সরবরাহকারী বেছে নেওয়া হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের অনেক দেশ রুশ জাহাজ এড়িয়ে চললেও ফারোতে এখনো রুশ মাছ ধরার ট্রলার ভিড়ে। কিছু রাজনীতিক আশঙ্কা করছেন, এসব জাহাজ নজরদারি বা নাশকতার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও বাল্টিক অঞ্চলের সমুদ্রতলের কেবল ছিন্ন হওয়ার ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে।

পরিচয়, ঐতিহ্য ও টিকে থাকার মনোভাব
ফারোর মানুষ নিজেদের কঠিন প্রকৃতির মাঝে টিকে থাকা এক জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখে। অনেকের বংশধারা হাজার বছর আগের ভাইকিংদের সঙ্গে যুক্ত। প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রবাদ—খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, আছে শুধু খারাপ পোশাক।
ঘাসের ছাদওয়ালা বাড়ি, স্বচ্ছ ঝরনার পানি, দীর্ঘদিন তালাবিহীন গাড়ি—সব মিলিয়ে নিরাপদ ও স্বতন্ত্র জীবনধারা আজও টিকে আছে।

স্বায়ত্তশাসনের পথে সতর্ক অগ্রগতি
অনেক ফারোবাসী মনে করেন, তারা বাস্তবেই প্রায় স্বাধীন। তবু বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন নেতারা।
স্বাধীনতার আলোচনা ভবিষ্যতে আবারও জোর পেতে পারে, কিন্তু আপাতত দ্বীপপুঞ্জ সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে—কারণ উত্তর আটলান্টিকের এই ছোট ভূখণ্ড এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমদ খানের পদত্যাগ ঘোষণা, নির্বাচনের আগে নতুন আলোচনা

উত্তর আটলান্টিকে নতুন ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে ফারো দ্বীপপুঞ্জ

০৬:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

উত্তর আটলান্টিকের মাঝখানে অবস্থিত ডেনমার্কের অধীনস্থ ফারো দ্বীপপুঞ্জ সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, জনসংখ্যা কম হলেও এই দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত গুরুত্ব “অসমানুপাতিকভাবে বড়”।

স্বাধীনতার দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা
দশকের পর দশক ধরে ফারোর বহু মানুষ ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে আসছেন। স্থানীয় ভেড়া খামারি ইয়োয়ানেস পাটুরসন বলেন, সংগ্রাম সবসময় থাকবে, কারণ তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মনে করেন।
১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার পক্ষে অল্প ব্যবধানে গণভোটে সমর্থন মিললেও ডেনমার্কের রাজা তা আটকে দেন। পরে ২০০০ সালে পূর্ণ সার্বভৌমত্বের আলোচনা শুরু হলে ডেনমার্ক ভর্তুকি প্রত্যাহারের হুমকি দেয়, ফলে তখনকার দুর্বল অর্থনীতির কারণে দ্বীপপুঞ্জ পিছু হটে।

অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার বাস্তবতা
গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ফারোর স্থানীয় অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী। স্যামন মাছ রপ্তানি থেকে বিপুল আয়, উন্নত টানেল নেটওয়ার্ক, এমনকি সমুদ্রের নিচে নির্মিত গোলচত্বর—সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার মান উচ্চ।
প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জে রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী গাঁজন করা মাটন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় মাছ ধরার নৌবহর, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও রুশ সাবমেরিন নিয়মিত এই জলপথ ব্যবহার করে।

গ্রিনল্যান্ড সংকটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি পুরো ডেনিশ রাজত্বে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এতে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের আরও কাছে সরে আসে এবং ফারো দ্বীপপুঞ্জও অধিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত রাখে।
তবে দ্বীপপুঞ্জের নেতারা স্বাধীনতার স্বপ্ন ত্যাগ করেননি। প্রধানমন্ত্রী অ্যাক্সেল ভি. ইয়োহানেসেন বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক বদলানো জরুরি—এ বিষয়ে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে।

কৌশলগত জলপথের কেন্দ্রে অবস্থান
ফারো দ্বীপপুঞ্জ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চোকপয়েন্ট জিআইইউকে গ্যাপের মধ্যে অবস্থিত, যা গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী জলপথ। এটি রাশিয়ার আর্কটিক থেকে আটলান্টিকে যাওয়ার প্রধান রুটগুলোর একটি এবং ন্যাটো এখানে টহল জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞ ট্রয় জে. বুফার্ডের মতে, জনসংখ্যা কম হলেও দ্বীপগুলো প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ চলাচল পথের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে।

চীন, রাশিয়া ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
২০১৯ সালে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ফারোর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় অংশ নিতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় সরবরাহকারী বেছে নেওয়া হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের অনেক দেশ রুশ জাহাজ এড়িয়ে চললেও ফারোতে এখনো রুশ মাছ ধরার ট্রলার ভিড়ে। কিছু রাজনীতিক আশঙ্কা করছেন, এসব জাহাজ নজরদারি বা নাশকতার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও বাল্টিক অঞ্চলের সমুদ্রতলের কেবল ছিন্ন হওয়ার ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে।

পরিচয়, ঐতিহ্য ও টিকে থাকার মনোভাব
ফারোর মানুষ নিজেদের কঠিন প্রকৃতির মাঝে টিকে থাকা এক জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখে। অনেকের বংশধারা হাজার বছর আগের ভাইকিংদের সঙ্গে যুক্ত। প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রবাদ—খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, আছে শুধু খারাপ পোশাক।
ঘাসের ছাদওয়ালা বাড়ি, স্বচ্ছ ঝরনার পানি, দীর্ঘদিন তালাবিহীন গাড়ি—সব মিলিয়ে নিরাপদ ও স্বতন্ত্র জীবনধারা আজও টিকে আছে।

স্বায়ত্তশাসনের পথে সতর্ক অগ্রগতি
অনেক ফারোবাসী মনে করেন, তারা বাস্তবেই প্রায় স্বাধীন। তবু বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন নেতারা।
স্বাধীনতার আলোচনা ভবিষ্যতে আবারও জোর পেতে পারে, কিন্তু আপাতত দ্বীপপুঞ্জ সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে—কারণ উত্তর আটলান্টিকের এই ছোট ভূখণ্ড এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে।