পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে বসবাসকারী হাজারো মানুষ গত মাসে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ইসলামপন্থি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির কথা বলে তাদের সরিয়ে নেওয়া হলেও এখন পাকিস্তান সরকার বলছে, এমন কোনো অভিযান পরিকল্পনাই করা হয়নি। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন।
তিরাহ উপত্যকায় হঠাৎ উচ্ছেদ নিয়ে বিভ্রান্তি
পাহাড়ি ও দুর্গম তিরাহ উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তপারের হামলার গুরুত্বপূর্ণ রুট ও ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় ও জাতীয় প্রশাসনের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজধানী ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কেন্দ্র সরকার বা সেনাবাহিনী এমন কোনো নির্দেশ দেয়নি।
সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ না হলেও জেলা প্রশাসনের ধারণা, জানুয়ারির শুরু থেকে শুরু হওয়া এই উচ্ছেদে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তীব্র শীত, তুষারপাত ও হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রার মধ্যেই তাদের সীমান্ত ছাড়তে হয়েছে।
অভিযান অস্বীকার, ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
জাতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে সামরিক অভিযান ও উচ্ছেদের বিষয়টি অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। ২৭ জানুয়ারি ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বাস্তুচ্যুতির ঘটনাকেই “মৌসুমি স্থানান্তর” বলে উল্লেখ করেন। সেনাবাহিনীও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
এই অবস্থায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো ভীত ও অসহায় বোধ করছে। তাদের অনেককে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের ক্ষতিপূরণ ও মাসিক ভাতা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় সেই সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, ফলে বাড়ি ফেরাও সম্ভব হচ্ছে না।
শীতের মধ্যে পালিয়ে আশ্রয়ের খোঁজ
বাসিন্দা ফজল বাদশাহ জানান, ১০ জানুয়ারি স্থানীয় মসজিদের মাইকে উচ্ছেদের ঘোষণা শোনার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে যান। তার ভাষায়, সরকার যেন তাদের দুর্ভোগের প্রতি উদাসীন।
অনেকেই তুষারঝড় ও একাধিক সরকারি তল্লাশিচৌকি পেরিয়ে প্রায় ৭০ মাইল পথ অতিক্রম করে পেশোয়ারের কাছে বারা শহরে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন। তিরাহর ব্যবসায়ী ইরশাদ আলী বলেন, কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে তাদের দুই দিন লেগেছে। এখন তারা আবারও অনিশ্চয়তায় আটকে আছেন, কারণ তাদের বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিই স্বীকৃতি পাচ্ছে না।

সহিংসতা বৃদ্ধি ও সীমান্ত রাজনীতির প্রভাব
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সহিংসতা বেড়েছে। পাকিস্তানি তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান আফগানিস্তানভিত্তিক ঘাঁটি থেকে পুলিশ স্টেশন ও নিরাপত্তা বহরে হামলা চালাচ্ছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে পাকিস্তানে প্রায় ৭০০ হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি এই সীমান্ত প্রদেশে।
ইসলামাবাদের উপকণ্ঠে একটি মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ৩১ জন নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পাকিস্তান আফগান তালেবানকে জঙ্গি গোষ্ঠীকে সহায়তার অভিযোগ এনে গত বছর ৯ লাখ আফগান নাগরিককে বহিষ্কার করে এবং কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালায়। তালেবান প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কেন্দ্র-প্রদেশ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
জেলা কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের শেষ দিকে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের বার্তা দেয়। সেই নির্দেশেই জানুয়ারি থেকে হাজারো পরিবার এলাকা ছাড়ে এবং এপ্রিল পর্যন্ত ভাতা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পায়।
১ ফেব্রুয়ারি এক রাজনৈতিক সমাবেশে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ সোহেল আফ্রিদি কেন্দ্র সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের জাতীয় সরকার ও বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়েছে। কেন্দ্র সরকারকে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে প্রদেশটি পরিচালিত হচ্ছে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের হাতে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
পিটিআই নেতারা সীমান্ত জেলাগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, ধারাবাহিক সামরিক অভিযান সাধারণ মানুষের ক্ষতি করেছে, কিন্তু জঙ্গিবাদের মূল কারণ দূর করতে পারেনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, স্থানীয় নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে এবং বিদ্রোহীরা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারে। গবেষক সৈয়দ ফখর কাকাখেলের মতে, কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকার নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করছে, আর এর মূল ভুক্তভোগী হচ্ছে সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















