তুষারঢাকা এক সকালে বাবার ফোন পেয়ে যেন মুহূর্তেই বদলে যায় ১৬ বছর বয়সী জোচিটল সোবারানেসের জীবন। জানানো হয়, মিনিয়াপোলিসের একটি সড়কে তাকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়ায় হঠাৎই পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। এক বছরেরও কম সময় আগে নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন তাদের মা। ছোট ভাইকে বোঝাতে হয়, বাবা দেরি করে কাজ করছেন—আর এদিকে গুছিয়ে তারা চলে যায় খালার বাড়িতে। সেই রাতের স্মৃতি আজও স্পষ্ট—একটি বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল চার ভাইবোন, একে অপরকে জড়িয়ে।
বন্ধ দরজার ভেতরের অস্থিরতা
কয়েক সপ্তাহ ধরে মিনিয়াপোলিস অঞ্চলে ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের জেরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাস্তায় বিক্ষোভ আর নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান দৃশ্যমান হলেও ঘরের ভেতরে চলছে আরও নীরব এক অস্থিরতা। শিশুদের কাছে বদলে যাচ্ছে তাদের পাড়া, স্কুল এবং নিরাপত্তাবোধ। তারা বুঝতে পারছে—বাড়ির বড়রা ক্লান্ত ও ভীত, প্রতিবেশীরা ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছে না, স্কুলে বোমা হুমকি আসছে, অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, বন্ধুদের দেখা মিলছে না, আর অনেক বাবা-মাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
জোচিটলের মনে তখন একটাই প্রশ্ন—বাবা ছাড়া তারা কীভাবে চলবে। পরীক্ষার মাঝেও সে খালাকে বোঝাতে থাকে, সে পড়াশোনা শেষ করেই ছোটদের দেখাশোনা করবে। খুব শিগগিরই তার এক বন্ধু, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তাকেও আটক করা হয়েছিল, পরে মুক্তি মেলে। তবু ভয়ের অনুভূতি থেকে যায়—যেন প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা।
সহিংসতার স্মৃতি ও মানসিক আঘাত
ডেসটিনি জ্যাকসনের ছয় সন্তান কোনোদিন ভুলতে পারবে না সেই দিনটি, যখন বাড়ি ফেরার পথে তারা হঠাৎ বিক্ষোভের মধ্যে পড়ে যায়। গাড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করতেই নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ার গ্যাস ও বিস্ফোরক শব্দের গ্রেনেডে কেঁপে ওঠে চারপাশ। বিস্ফোরণে গাড়ির এয়ারব্যাগ খুলে যায়, ধোঁয়া ঢুকে পড়ে ভেতরে। কোনোমতে বেরিয়ে আসলেও ছয় মাসের শিশুটিকে বাঁচাতে সিপিআর দিতে হয়। এরপর থেকে শিশুদের কেউ দুঃস্বপ্নে কাঁদে, কেউ সারাক্ষণ নিরাপত্তা ক্যামেরা দেখে, কেউ আবার শব্দ শুনলেই চমকে ওঠে।
ভয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম
মাত্র নয় বছর বয়সেই গায়েল দে লিয়ন নিজের পাসপোর্ট ব্যাগে বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হলেও মেক্সিকান বংশোদ্ভূত হওয়ায় তার পরিবার আশঙ্কায় থাকে। স্কুলে যেতে বা বাসে উঠতে সে ভয় পায়—যেন যেকোনো সময় তাকে নিয়ে যাওয়া হতে পারে।
পাঁচ বছরের লিয়াম কোনেহো রামোসকে স্পাইডারম্যান ব্যাগসহ বাবার সঙ্গে আটক করার দৃশ্যটি পুরো অঞ্চলে গভীর আলোড়ন তোলে। পরে আদালতের নির্দেশে সে বাড়ি ফিরলেও ঘটনাটি শিশুদের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়ায়। একই সময়ে এক স্কুলে সশস্ত্র কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের ওপর রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহারের ঘটনাও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা কিশোরদের মনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
স্থায়ী মানসিক ক্ষতের আশঙ্কা
স্কুলের সমাজকর্মীরা বলছেন, আগে শিক্ষার্থীরা বন্ধুত্বের সমস্যা নিয়ে সাহায্য চাইত। এখন তারা জানতে চায়—পরিবার ভেঙে যাওয়া ও বন্ধুদের হারানোর যন্ত্রণা কীভাবে সামলাবে। এমনকি খুব ছোট শিশুরাও দেখা দৃশ্যের অভিঘাতে ঘুমের সমস্যা ও ভয়ের লক্ষণ দেখাচ্ছে।
স্বল্প স্বস্তি, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা
জানুয়ারির শেষ দিকে জোচিটলের বাবা মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। নাগরিকত্বের আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলা ও অপরাধের রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও তাকে আটক করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশে মুক্তি মিললেও পরিবারের ভয় কাটেনি। বাবাকে জড়িয়ে ধরার আনন্দের মাঝেও জোচিটলের মনে রয়ে গেছে একটাই দুশ্চিন্তা—আবার যদি তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















