মস্তিষ্কের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নড়াচড়া করতে পারে—এমন নমনীয় মাইক্রোইলেক্ট্রোড তৈরি করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। জাপানের কাগজ কাটা–ভাঁজ করার ঐতিহ্যবাহী শিল্প কিরিগামি থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও স্থিতিশীল মস্তিষ্ক–কম্পিউটার সংযোগ তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার ইলেকট্রনিক্সে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই নতুন নকশা মূলত মস্তিষ্কে স্থাপিত ইলেক্ট্রোড সরে যাওয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করতেই তৈরি করা হয়েছে। এর আগে ইলন মাস্কের নিউরালিঙ্ক প্রকল্পেও এ ধরনের জটিলতা সামনে এসেছিল, যেখানে ইমপ্লান্টের কার্যকারিতা আংশিকভাবে কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে।

কিরিগামি থেকে অনুপ্রেরণা
চীনা বিজ্ঞান একাডেমির গবেষক দল বলছে, কিরিগামি শিল্পে যেমন কাগজ কেটে ও ভাঁজ করে জটিল ত্রিমাত্রিক নকশা তৈরি করা হয়, তেমন ধারণা থেকেই তারা সর্পিল ও প্রসারণশীল মাইক্রোইলেক্ট্রোড তৈরি করেছেন। এই সর্পিল বিন্যাস মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, ফলে ইলেক্ট্রোড সরে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
মস্তিষ্ক–কম্পিউটার সংযোগ কীভাবে কাজ করে
মস্তিষ্ক–কম্পিউটার সংযোগ প্রযুক্তিতে ইলেক্ট্রোডের মাধ্যমে স্নায়ুকোষের সংকেত সংগ্রহ করা হয়। সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার বা যান্ত্রিক বাহু নিয়ন্ত্রণের মতো কাজ করা সম্ভব হয়। সাধারণত এই ক্ষুদ্র সেন্সরগুলো মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সে স্থাপন করা হয়, যা চিন্তা, স্মৃতি, চেতনা ও স্বেচ্ছাচালিত নড়াচড়ার সঙ্গে যুক্ত।
তবে সমস্যা হচ্ছে, প্রাইমেট প্রাণীর মস্তিষ্কে উল্লেখযোগ্য নড়াচড়া হয়। ফলে সরলরেখা আকারের প্রচলিত ইলেক্ট্রোড সহজেই সরে যেতে পারে। এতে রেকর্ডিংয়ের নির্ভুলতা কমে, নির্দিষ্ট অংশে লক্ষ্যভেদে সমস্যা হয় এবং টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রদাহ বা স্নায়ুকোষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নিউরালিঙ্কের অভিজ্ঞতা ও নতুন সমাধান
২০২৪ সালে নিউরালিঙ্কের প্রথম মানব রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের এক মাস পর ইমপ্লান্টের বড় অংশের কার্যকারিতা কমে গেছে। সে সময় বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাপিত নমনীয় ইলেক্ট্রোডের একটি বড় অংশ সরে গিয়েছিল। যদিও অ্যালগরিদম সমন্বয় করে আংশিক কার্যকারিতা ফেরানো হয়, তবু ইলেক্ট্রোড সরে যাওয়া বড় বাধা হিসেবেই থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে চীনা গবেষকরা উচ্চমাত্রায় প্রসারণশীল, সর্পিল আকৃতির মাইক্রোইলেক্ট্রোড তৈরি করেন। পরীক্ষার জন্য মানুষের সঙ্গে গঠনগত মিল থাকায় মাকাক প্রজাতির বানর ব্যবহার করা হয়। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এই ইমপ্লান্ট একসঙ্গে ৭০০–এর বেশি সেরিব্রাল কর্টেক্স স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহৎ পরিসরে রেকর্ডিং
ইমপ্লান্ট স্থাপনের সময় ঘর্ষণজনিত ক্ষতি এড়াতে প্রথমে মস্তিষ্কের উপরিভাগে একটি হাইড্রোজেল স্তর বসানো হয়। এরপর জলীয় মাধ্যমে দ্রবণীয় বাহকের সাহায্যে সর্পিল থ্রেডগুলো নির্দিষ্ট গভীরতায় প্রবেশ করানো হয়। থ্রেডের ভিত্তি অংশ স্বাধীনভাবে ভাসমান রাখা হয়, যাতে মস্তিষ্কের নড়াচড়ার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
গবেষকদের দাবি, এই পদ্ধতিতে বৃহৎ এলাকায় উচ্চঘনত্বে স্নায়ুকোষের সংকেত দীর্ঘ সময় ধরে রেকর্ড করা সম্ভব। এতে স্নায়ুকোষগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া থেকে মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়া আরও গভীরভাবে বোঝা যাবে।
চীনের এই উদ্ভাবন মস্তিষ্ক–কম্পিউটার সংযোগ প্রযুক্তিকে আরও স্থিতিশীল, নিরাপদ ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি পুনরুদ্ধার বা জটিল স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















